ভুয়া ডিবি

কেরানীগঞ্জে আতংকের নাম সাদা পোষাকে ভুয়া ডিবি পুলিশ

ঢাকার কেরানীগঞ্জে সাদা পোষাকধারী ভুয়া ডিবি পুলিশ এই এলাকার জনসাধারনের জন্য ভয় এবং আতংকের অন্যতম কারন হয়ে দাড়িয়েছে। গত কয়েকমাসে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে সাদা পোষাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়দানকারী ব্যাক্তিরা। এদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা পেশাদার অপরাধী আবার অনেকেই রয়েছে পুলিশ বাহিনীর সদস্য। বেশ কয়েকটি ডাকাতি ও ছিনতাই এর ঘটনায় পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় সদস্যদের জড়িত থাকায় এলাকায় জনগনের মনে আতঙ্ক আরো বেড়ে গেছে।

জানা যায়, গত ১৪ নভেম্বর কেরানীগঞ্জের আগানগরে কাঠুরিয়া এলাকায় মাদক মামলায় ফাসানোর ভয় দেখিয়ে প্রকাশ্যে এক ব্যাক্তির কাছ থেকে সাদা পোষাকে চাদা আদায় করে দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানাধীন তেলঘাট পুলিশ ক্যাম্পের এ.এস.আই জহিরুল ইসলাম, কনস্টেবল আল আমিন,নিশাত ও ইমরান। শামীম নামে এক ব্যাক্তিকে আটক করে মাদক মামলার ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবী করে তার সাথে থাকা ৬ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশের এই সদস্যরা। একই দিনে তারা আরো কয়েকজন যুবককে সাদা পোষাকে আটক করে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় বলে প্রমান পাওয়া যায়। ঘটনা জানাজানি হলে পরে এই তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায় তেলঘাট পুলিশ ক্যাম্পের এই সদস্যরা প্রায়ই সাদা পোষাকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সাধারন জনগনকে ভয় ভীতি দেখিয়ে চাদাবাজি করতো।

এর আগের দিন ১৩ নভেম্বর কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর দড়িগাও এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাদা পোষাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ৮৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এক দল ছিনতাইকারী। ব্যবসায়ী কেরামত আলী জানান, ১৩ তারিখ দুপুরে বাজার থেকে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় আব্দুল্লাহপুর ভাওর ভিটি এলাকায় পৌছালে ডিবি পুলিশ লেখা একটি সিলভার রঙের মাইক্রোবাস তাদের গাড়ির সামনে এসে দাড়ায়। এ সময় ওয়াকিটকি ও পিস্তলসহ ৭-৮ জনের একটি দল টাকার ব্যাগসহ ব্যবসায়ী কেরামত আলী ও তার গাড়ির ড্রাইভারকে ডিবির পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। কেরামত আলী কৌশলে মাইক্রোবাস থেকে লাফ দিলে ছিনতাইকারীরা তাদের মাইক্রোবাসটি টান দেয়। কিছুদূর যেয়ে ড্রাইভারকে ফেলে দিয়ে টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যায়।

গত ২ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের জনি টাওয়ারের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে বরুন নামে এক স্বর্নের দোকানের কর্মচারীর কাছ থেকে ৯৮ ভরি স্বর্ন রেখে দেন একদল ডাকাত। বরুন মানিকগঞ্জের সিংগার উপজেলার জামটি বাজারের সোলাইমান জুয়েলার্সের কর্মচারী। তিনি রাজধানীর তাতিবাজারে স্বর্নের বার দিয়ে অলংকার তৈরীর উদ্দ্যেশ্য গিয়েছিলেন। দোকান বন্ধ থাকায় স্বর্নের বার নিয়ে তিনি কেরানীগঞ্জ হয়ে মানিকগঞ্জ ফিরছিলেন। পথিমধ্যে কেরানীগঞ্জের জনি টাওয়ার সামনে আসলে ডাকাতির ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনার ১০ দিন পরে ৮ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। এই ৮ জনের মধ্যে একজন ছিলো লালবাগ থানার পুলিশ সদস্য কামরুজ্জামান। পুলিশ সদস্য কামরুজ্জামান কিভাবে ডাকাত দলের সাথে সংযুক্ত হলেন এ নিয়ে অনেকের মনে বিষ্ময় দেখা দিয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেছিলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা ঢাকা ও এর আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায় সাদা পোষাকে পুলিশের পরিচয়ে নিয়মিত ডাকাতি করতো।

এর আগে আগষ্ট মাসে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাইকালে ইস্পাহানী আবাসিক এলাকা থেকে ফরহাদ হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব ১০।

ঐ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিল্পী বেগম (৪০) জানায়, আগষ্টের ২ তারিখে রাতে ৫ জন ডিবি পরিচয়ে আমার বাসায় হানা দেয়। এসময় তারা আমার মেয়ে ও দেবর কে মারধর করে বাসা থেকে ১২ টি মোবাইল ও ৫০ হাজার টাকা ক্যাশ নিয়ে যায়। সেই সাথে আমার দেবরকেও সাথে নিয়ে যায়। কেরানীগঞ্জের ঝিলমিলে নিয়ে গিয়ে আমার দেবরের সাথে থাকা ২৯ হাজার টাকা ও তার ফোন নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। তখন আমি বুঝতে পারি এরা আসলে ভুয়া। এর কিছু দিন পরে ঐ ব্যাক্তিদের ইস্পাহানী নদীর পারে দেখলে আমার ডাক চিৎকারে এলাকাবাসী তাদের আটক করে, পরে তাদের র‍্যাব ১০ এসে নিয়ে যায়।

গত ১৮ মার্চ ডিবি পরিচয়ে কেরানীগঞ্জের ইস্পাহানী ঘাট থেকে স্বর্নের বার ছিনতাই কালে ২ জনকে আটক করে স্থানীয়রা পুলিশে দিয়ে দেয়। দোহারের জয়পাড়া এলাকার অরিন্দ্র জুয়েলার্সের মালিক বিকাশ হালদার জানান, আমরা ১১ টি স্বর্নের বার বিক্রির জন্য ঢাকার তাতিবাজার যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে কেরানীগঞ্জের আগানগর ইস্পাহানী ঘাট এলাকায় আসলে  ১০/১৫ জন ডিবি পরিচয়ে আমাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলার জন্য জোড় করতে থাকে। আমরা চিৎকার চেচামিতে আশে পাশের লোকজন এগিয়ে আসলে তারা সবাই  পালাতে থাকে। কিন্তু স্থানীয়রা ২ জনকে ঘটনা স্থল থেকে ধরে ফেলে। পরে তাদের পুলিশে দেয়া হয়। এ ঘটনায় আটক দুজন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত ছিলেন বলে জানা যায়।

এদিকে গত কয়েকমাসে কেরানীগঞ্জে সাদা পোষাকে  ডিবির পরিচয় দিয়ে বেশ কয়েকটি ছিনতাই এর ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পরেছে স্থানীয় জনসাধারন। কোনটা আসল ডিবি কোনটাই বা নকল ডিবি এই ব্যাপারে অণেকেরই ধারনা নাই । যার কারনে বেশ চিন্তিত কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী ও সাধারন জনসাধারন।

শাহনেয়াজ নামে জিনজিরার স্থানীয় একজন জানান, গত কয়েকদিন আগে রাতের বেলায় আমার বাসায় এক ভাড়াটিয়ার ঘরে ৮/১০ জন লোক ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ঢুকে তল্লাশী করতে চায়। আমি ঐ পোশাকধারীদের জেরা শুরু করলে তারা জানায় তারা দক্ষিন কেরানীগঞ্জ থানা থেকে এসেছে। আমি বললাম আপনাদের তো পুলিশের মতো লাগছে না। এর পরে তারা দ্রুত ঘটনা স্থল ত্যাগ করে চলে যায়। কেরানীগঞ্জে এখন সাদা পোশাকে পুলিশের ডিউটি ভয়ংকর এক আতংকের নাম।

মো আসমত আলী নামে আগানগরের এক ব্যবসায়ী জানান, সাদা পোষাকে ডিবি পুলিশ এখন কেরানীগঞ্জে আতংকের নাম হয়ে গেছে। কেরানীগঞ্জে এখন অহরহ অনেক অপরাধী ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চাদাবাজি, ডাকাতির ঘটনা সহ নানা অপরাধ ঘটছে। সাধারন মানুষ অনেকেই বুঝে না কোনটা আসল ডিবি পুলিশ আর কোনটা ভুয়া। ফলে অপরাধীরা এইটার সুযোগ নিয়ে অপরাধ করছে।

ঢাকা জেলা দক্ষিন ডিবি অফিসার ইনচার্জ সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই, ডাকাতির ঘটনাগুলো অবশ্যই ভালো ভাবে দেখার সুযোগ নেই। ডিবির পরিচয়ে অপরাধের ঘটনাগুলো নিয়ে  শুধু আমাদের ডিবি পুলিশ না, পুলিশের ডিএসবি, কাউন্টার টেরিজমসহ অন্যান্য ইউনিট কাজ করছে। আশা করি দ্রুত ভালো কিছু রেজাল্ট আমরা পাবো। এই সকল ঘটনায় সক্রিয় পুলিশ সদস্য রয়েছে কিনা এটা আমার জানা নাই। কেরানীগঞ্জ একটি জনবহুল ব্যস্ত এলাকা। এখানে ভাসমান লোকজনের সংখ্যা অনেক বেশি । তাই অপরাধীরা নানান ধরনের অপরাধ সহজেই করতে পারে। তবে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি সকল ধরনের অপরাধ নির্মূলে।

ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরানীগঞ্জ সার্কেল) শাহাবুদ্দিন কবীর জানান, ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই ডাকাতির ঘটনায় সক্রিয় কোন পুলিশ সদস্য থাকলে আমরা তাকে ছাড় দিচ্ছি না। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলাও হচ্ছে আবার বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে তার চাকরীও চলে যাচ্ছে। তবে ডিবি যেহুতু আমার অধীনস্ত নয়, এই বিষয়ে আমার বিশেষ কিছু বলার কিছু নাই। কেরানীগঞ্জ যেহুতু একটা রুট, ভুয়া ডিবির ঘটনা এখানে প্রচুর প্রতারনা হচ্ছে, তবে আমাদের আটকের সফলতাও রয়েছে অনেক। গেল কয়েকমাসে আমরা অনেক ভুয়া পুলিশ,ডিবি গ্রেপ্তার করেছি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে সাধারন জনগনের সচেতনতার অভাবেই এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। তারা বড় এমাউন্টের নগদ টাকা কিংবা স্বর্নের বার বহনের ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগীতা নেয় না। যার কারনে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যায়। আমাদের ইনফর্ম করলে আমরা যে কোন সাধারন জনগনকে সিকিউরিটির বিষয়ে হেল্প করতে পারি, কিন্তু কেও চায় না আর এই ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। সাধারন জনগনের প্রতি অনুরোধ থাকবে, বড় কোন এমাউন্ট অথবা স্বর্নের বার বহনে ৯৯৯ এ ফোন দিন অথবা নিকটস্থ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগীতা নেন। সাধারন জনগন সচেতন হলে এই ধরনের ঘটনা অনেক অংশে নির্মূল করা সম্ভব। #

 

নিউজ ঢাকা ২৪।

 

আরো পড়ুন: কেরানীগঞ্জে র‍্যাবের অভিযানে ১ কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধার

Check Also

ডিসি সম্মেলন

চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন শুরু হচ্ছে কাল

চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শুরু হচ্ছে আগামীকাল। রোববার (৩ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা …