ইতালিতে মানব পাচারের শিকার দুই ভাই: “দেশে ফিরলে মৃত্যু, এখানেও জীবন ঝুঁকিতে”

রোম, ইতালি:

বাংলাদেশ থেকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ইতালিতে এসে মানব পাচার চক্রের খপ্পরে পড়েছেন দুই ভাই – মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আহসান হাবীব। ২০২৩ সালের ২৯শে জুলাই সরকারি ওয়ার্ক ভিসার স্বপ্ন নিয়ে রোম এয়ারপোর্টে পা রাখার পর থেকেই তাদের জীবন চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে। এখন তারা দেশে ফিরতেও পারছেন না, কারণ সেখানে দালালদের কাছ থেকে আসছে প্রাণনাশের হুমকি, আর ইতালিতেও অবৈধভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্বপ্নভঙ্গের শুরু:
নাহিদুল ইসলাম জানান, ২০১৯ সাল থেকেই তাদের পরিবার দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে জর্জরিত। তিন বোনের পর দুই ভাই, যার ফলে বাবা-মায়ের উপর চাপ আরও বেড়ে যায়। অর্থকষ্টের কারণে নাহিদুল এবং তার ভাই আহসান হাবীবের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ২০২০, ২০২১, এবং ২০২২ সাল কেটে যায় চরম হতাশার মধ্যে। ২০২২ সালের শেষের দিকে, একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয় এক দালাল চক্রের সাথে, যারা ইতালিতে স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক এবং ট্যুরিস্ট ভিসার শতভাগ নিশ্চয়তা দিত।

দালাল চক্রের ফাঁদ:
ফেসবুক পেজ থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ঢাকার আশুলিয়ায় দালালদের ট্রাভেল এজেন্সিতে যোগাযোগ করেন নাহিদুল ও আহসান। সেখানে তারা তাদের পারিবারিক দারিদ্র্য এবং করুণ পরিস্থিতি দালালদের কাছে তুলে ধরেন। দালালরা তাদের ইতালিতে নিয়ে আসার শতভাগ আশ্বাস দেয়। জীবনের চাকা ঘোরানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে, দুই ভাই জমি-সম্পদ বিক্রি করে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দালালদের ৩০ লক্ষ টাকা দিতে রাজি হন। ইতোমধ্যে, তারা প্রায় ২০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি ও হুমকি:
নাহিদুল ও আহসান হাবীবের অভিযোগ, দালাল চক্রে মাসুদ ইকবাল ও রিপন মিয়া নামে দুই ৪০-৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তি জড়িত ছিল, যাদেরকেই তারা সরাসরি চিনতেন। ইতালিতে আসার পর দালালরা তাদের বৈধতা দেয়নি। ফলে এখন তারা অবৈধভাবে কাজ করে কোনোমতে পেটে ভাতে বেঁচে আছেন। একদিকে ব্যাংকের ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি মিলছে না। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, দালালরা অজ্ঞাত নম্বর থেকে বাকি ১০ লক্ষ টাকার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছে। তারা হুমকি দিচ্ছে, যদি বাকি টাকা না দেওয়া হয় এবং তাদের নাম প্রকাশ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশে থাকা তাদের পরিবারের উপর হামলা চালানো হবে। একই সাথে, দালালরা তাদের সতর্ক করেছে যে, এই মুহূর্তে দেশে ফিরে গেলে তাদের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়বে।|

আর্তনাদ ও আন্তর্জাতিক আবেদন:
“যদি এই মুহূর্তে সরকার আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে একদিকে আমাদের জীবননাশের ভয়, তার উপর ব্যাংকের ঋণের বোঝা যা পরিশোধ করা অসম্ভব,” বলেন নাহিদুল। “আমাদের জীবন আরও চরম ঝুঁকিতে চলে যাবে।” এই অসহায় পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আহসান হাবীব ইতালি সরকারের কাছে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তার আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, যদি ইতালি সরকার তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়, তাহলে তারা জীবনের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারবেন, বৈধভাবে কাজ করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন, পরিবারকে সাহায্য করতে পারবেন এবং নিজেদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারবেন। তাদের এই আবেদন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যারা এই দুই ভাইকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

দেশের মানুষকে সতর্কবার্তা:
নাহিদুল ইসলাম দেশের সকল মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “আমি দেশের সকল মানুষকে সর্তক করে দিতে চাই, যাতে তারা কখনো সরকারি নোটিশ ঘোষণা ছাড়া দালালের খপ্পরে না পড়ে। এবং যত অবৈধ পথ আছে ইতালিতে আসার, যেমন লিবিয়া দিয়ে সমুদ্র পাড়ি, রোমানিয়া ইত্যাদি, সেগুলো যাতে অনুসরণ না করে। কেননা এতে করে প্রাণ হারানোর ভয় থাকে। কারণ প্রতিনিয়ত শত শত যুবক লিবিয়া হয়ে ইতালি আসতে সমুদ্র ডুবিতে মারা যায়। আপনারা কেউ স্বপ্নের পিছনে ছুটতে গিয়ে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না।

Check Also

বাংলাদেশে সরকার পতনের জন্য দায়ী দুর্বল শাসন ব্যবস্থা :অজিত দোভাল

বাংলাদেশে সরকার পতনের জন্য দায়ী দুর্বল শাসনব্যবস্থা :অজিত দোভাল

বাংলাদেশে সরকার পতনের জন্য দুর্বল শাসনব্যবস্থা মূল কারণ বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা …