কালিভক্ত

খেলাপি কালিভক্ত এবং আমাদের নেতা

 পাগলকে যতই নৌকা নাড়াচাড়া করতে বাড়ন করা হউক। সে ততই নাড়াতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমি ছিলাম ঠিক তেমনি একজন। সব সময় কৌতুহলি হয়ে থাকতাম। নিশিদ্ধ জিনিসের প্রতি আগ্রহ বেশেই ছিলো আমার। মুক্তচিন্তা থেকে শুরু করে সব ধর্মের বই পুস্তকের প্রতি নেশা ছিলো প্রচন্ড।  খেলাপি কালিভক্ত এবং আমাদের নেতা

যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং আমার ধর্মে গ্রন্থের পাশাপাশি এগুলোর প্রতিও ছিলো বেশ আগ্রহ। এর ধারাবাহিকতায় একটা সময় সনাতনী হিন্দু ধর্মের অনেক বই আমি পরেছি, বিভিন্ন গল্প কাহিনী ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে বহু বার পড়া একটি গল্পের কথা আজ আপনাদের শোনাবো। যে কোনো একটা বিপদে পরে মা কালীর এক ভক্ত তার কাছে দুটো পাঠা মানত করেছিলো। কিছু দিন পর ভক্তের সে মনোভাসনা পূরণ হওয়ার পর মানতের কথা ভুলে যায়।
ভক্তের সয়নকালে মা কালীই তাকে একদিন সেই মানতের কথা মনে করিয়ে দেন। তখন ভক্ত মা কালীকে বলে ” মা, মাগো বড় অভাবের ভেতর দিনানিপাত করছি। এ যাত্রায় দুটো পাঠা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। আমি তোমাকে বরং একটা পাঠা দেবো। ’’ মা কালী বেজায় অখুশি হলেও শেষ আব্দি বললেন, ‘‘দে তাই দে।’’তার পরেও ভক্তের মুখে নাম নেই মানত পূরণের। এই ভাবেই সময় চলতে লাগলো।
দেবী একটু মন ক্ষুন্ন হয়ে পূনঃরায় একদিন মনে করিয়ে দিলেন ‘‘কী হল তোর? একটা দিতে চাইলি সে পাঠাও তো দিলি না!’’ ভক্ত তখন খুব চুতুরতার সাথে ফের বলে উঠল ” মা গো মা তুমি তো সব খবরই রাখো। আমার একটা পাঠা কেনার মতো পঁয়সাও নেই। তখন মা কালি রাগন্বিত হয়ে জানতে চান, ‘‘তাহলে তুই কি কিছুই দিবি না?’’ ভক্ত তার বিনয় ভক্তিতে বলে উঠল ‘‘তা কি আর হয় মা! এবার না হয় তোমাকে এক খানা ফড়িং বলি দিই?’’ মা কালী তার বিভিন্ন ফন্দিফিকিরে বেশ অতিষ্ঠ, তাই বললেন, ‘‘বেশ তবে তাই দে।’’ আগের মত ভক্ত আবার কথার বরখেলাপ করে । ভক্ত মুখে বিনে পঁয়সার সামান্য ফড়িংটাও বলি দেওয়ার নাম নেই। সর্বশেষ মা কালী পুনঃরায় একদিন ভক্তকে বলেন, ‘‘বাছা, তুই আবারো ভুলে গেলি!’’ এবার ভক্তের মুখে কথার ভিন্ন সুর। ভক্ত মা কালিকে বলে, ‘‘মা, কী যে বলো না। তোমাকে কি ভুলতে পারি! সংসারের ঘানি টানতে – টানতে দিন রাত আমি যে কত ব্যস্ত থাকি জানো তো! এর মধ্যে ফড়িং কখন ধরি ? এবার বরং একটা কাজ করো না মা —এক খান ফড়িং ধরে তুমিই খাও না কেন?’’
।।দুই।। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সাধারণ জনগণের অবস্থা ওই মা কালির মত। আর বেশির ভাগ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাজ কারবার চরম খেলাপি ভক্তটির মতো নয় কি? আমরা মূলত পাঠ্যপুস্তক আর দলিল দস্তাবেজ খাতা কলমে গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক। অনেকে কথায় কথায় বলে থাকেন বহু দলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। যার ধারাবাহিকতায় সবকিছু ঠিক হয় ভোটের মাধ্যমে। স্কুল ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য নির্বাচনের আয়োজন হয় আমাদের দেশে। জাতীয় নির্বাচনের ভোট মানেই চলে ক্ষমতার গদি দখলের জন্য মরিয়া লড়াই। ভোটে চুরি, ডাকাতি হয় কিন্তু চুরি বিদ্যে দিয়ে সবটা হয় না। আম জনতাকে খুশি করার তাগিদ থাকে বটে কিন্তু ভোটারদের মন ভোলানোর চেষ্টা তো সব দল সব প্রার্থীই করে থাকেন। অতএব নির্বাচনকে ঘিরে চটকদার সব সুযোগ সুবিধার ইশতেহার সব দলই কম বেশি দিয়ে থাকে।
এক দল যদি দশটা সুবিধা দেওয়ার কথা বলে তো আর এক দল বলে ডজন ক্ষানেকের প্রতিশ্রুতি এইভাবে ভিন্নতা পায় ইশতেহারে। নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন প্রার্থির বক্তৃতায় উঠে আসে ধুলো পড়া নানারকম ঘটনা বলি। যা ভোটারদের মনে প্রভাব ফেলতে সহায়ক বলে মনে করে থাকেন অনেকে। দেশের সকল দূর্গন্ধকে সুগন্ধি করে তোলা থেকে শরু করে, মিষ্টি কথার নানা গল্প নির্বাচনী ইশতেহারে জায়গা পায়। ভোট আকর্ষণের জন্য যা-খুশি প্রতিশ্রুতি বিতরণকে অনেক দল ‘রাজনৈতিক অধিকার’ বলেই মনে করে থাকেন। একাদশ জাতিয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে ইশতেহার দিয়েছে তা নির্দিষ্ট সময়ে আধো যথাযথ সম্পূর্ণ হবে কিনা আমার জানা নেই। তার কিছুটা সম্পূর্ণ হলেও বাংলাদেশ সোনার বাংলায় পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
প্রথম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে দশম সংসদ পর্যন্ত যত ইশতেহার প্রতি পাঁচ বছর পর পর বিভিন্ন দল দিয়ে এসেছে তার কতটুকুই বা বাস্তবায়ন হয়েছে তাই পরিলক্ষিত করার বিষয়। তবে একে বারে যে বাস্তবায়ন হয়নি তা নয়। দল মত ভিন্নতায় অনেকাংশে হয়েছে। তবে যথাযথ হতে পারলে চিন, মালেশিয়া মত আমরাও অনেক উন্নত হতে পারতাম বা তার চেয়েও বেশি। চুরি,ডাকাতি হয় ভোট। আবার অনেকের মৃত আত্মিয়- স্বজন এসেও নাকি ভোট দিয়ে যায় ভোটের সময়।, তাই একটু জোকস করেই বলতে ইচ্ছে করে। এই সুযোগে আপনারা দেখা করে নিতে পারেন নিজেদের আত্মীয়েরদের সাথে ভোট কেন্দ্রে।
চুরি,ডাকাতি হয় ভোট। আবার অনেকের মৃত আত্মিয়- স্বজন এসেও নাকি ভোট দিয়ে যায় ভোটের সময়।, তাই একটু জোকস করেই বলতে ইচ্ছে করে। এই সুযোগে আপনারা দেখা করে নিতে পারেন নিজেদের আত্মীয়েরদের সাথে ভোট কেন্দ্রে। নির্বাচনের সময় আলোচনায় আসতে গরম গরম ইশতেহার দিয়ে থাকেন প্রায় অনেক নেতা। সাধারণ মানুষদের অনেকে দুঃখ করেই বলেন। নির্বাচনের মাধ্যমে মুখ বদলায় কিন্তু গরিবের ভাগ্যটা আর বদলায় না। দেখা যায় আদালতে কথা বলার সময় ‘‘যাহা বলিব সত্য বলিব …’’ বলার মাধ্যমে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয়। কিন্তু, গণতান্ত্রিক একটি দেশের জনগনের আদালত সর্বোচ্চ হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতির কিছু ব্যবসায়ীরা হাজারটা অসত্য ভাষণ হরহামেশ দিয়ে থাকেন তাতে বিন্দু মাত্র কোন্ঠাবোধ করেন না।
দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাই এত নিচুমানের যে প্রতি পাঁচ বছর পর পর আমরা ভুলে যাই। আর পুরোনো চলচিত্রের মত অভিনয়গুলো নতুন করে উপভোগ করতে। এই মেধাহীন রাজনীতির কারণে গ্রাম থেক শহর অনেক নরনারী বুনিয়াদি অথনৈতিক ন্যায়বিচার থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের দেশের নিম্ন আয় ও বস্তি বাসীর সংখ্যা অনেক দেশের মূল জন সংখ্যার সমান প্রায়। দেশের অনেক মানুষ এমন দারিদ্র আর অধিকারহীন পরিস্থিতির মধ্যে আছে যে তারা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে, এমনকী শিশুশ্রম নিঙড়ে দিয়েও দু’বেলা পেটপুরে খাবার পায়না।
কাজেই, সাধারণ মানুষের কথা ভেবে এমন ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যা নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই পূরণ করা সম্ভব। আর পূরণ করার দায়িত্ব যাঁরা নেবেন। সুসভ্য মানবিক মুখ ছাড়া মানুষের ভালো করতে পারবেন না। তাই রাজনীতিতে সাধুবাদ জানাই ভালো মানুষগুলোকে যারা সত্যিকার অর্থেই দেশটাকে ভালোবাসেন। আশা করবো এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ প্রেমি ও সাধারণ মানুষের জন্য কিছু কাজ হবে, যাতে করে মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা যেনো পায়। খুন, ঘুম ও ধর্ষণের বিচার যেনো হয়। বিচার বিহীনতার সাংস্কৃতি যেনো শুরু না হয় আবার।
হযরত আলী এবং তাঁর মেয়ে আয়েশা (১০) গাজীপুরের শ্রীপুর রেল স্টেশনে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে কারণ অনেকের ধারে ধারে ঘুরেও যখন একজন বাবা তার মেয়ের ধর্ষণের বিচার পায়নি এই দেশ, এই সমজের কাছে তাই নিরবেই চলে গেলেন বড্ড অভিমান নিয়ে।
সাধারণ মানুষ এমন কিছু আর দেখতে চায় না। যাতে গণতন্ত্রটা পবিত্র ও উপভোগ্য হতে পারে। দল ও ধর্ম যার যার দেশটা সবার। দল ও ধর্মের দোহায় দিয়ে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটুক। লেখার শুরুতে বলা সেই খেলাপি মা কালী ভক্তের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে। আমাদের নেতারা সেখান থেকে বেড়িয়ে আসলে। সোনার বাংলা নামটি সত্যিকারের অর্থেই অর্থবহ হবে।
খোরশেদ মাহমুদ
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
khurshadmahmud@gmail.com
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

ইবি ক্যারিয়ার ক্লাবের সভাপতি আশিক, সম্পাদক মাহী

সিয়াম, ইবি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গুনগত মান পরিবর্তন ভিত্তিক ক্লাব ক্যারিয়ার ক্লাবের (২০২১-২২) বর্ষের নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!