কোরবানী

কোরবানী ঈদে বাড়ি যাওয়া

কোরবানী ঈদে পশু জবেহ করে ঈদের আনন্দ উৎসব উপভোগ করার জন্য মানুষ নিজ কর্মস্থালে থেকে সীমাহিন যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, যাত্রা পথে নিদারুন কষ্ট সহ্য করে হৃদয় মন প্রানের রক্তের শৈশব সৃতিমাখা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

লাইনে দাড়িয়ে কিংবা অনলাইনে টিকেট কিনার পরও বাসে সিট নেই,ট্রেনের ভিতরে দাড়াবার জায়গা নেই ও লঞ্চের ছাদ পর্যন্ত উপচে ভরা ভির থাকা সত্বেও ঈদে বাড়ি ফেরা কী যে অনন্দ তা কেবলই তারাই বলতে পারবে যারা গ্রমের বাড়িতে পরিবারের সাথে ঈদ করে। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে নিজ গ্রাম থেকে শহরে এসে চাকরী বা ব্যবসার কারনে যে সংসার বাজার সামলিয়ে জীবন সংগ্রামে ছুটে চলার পর তার মন দমে যায়। তখন কোথাও বেড়াতে যাওয়ার চেয়ে গ্রামে গেলেই তার ভাল লাগে।

কেননা অনেক পরিচিত মানুষের সাথে কথা হয় নিজের শৈশব কৈশোররের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো খুব আনন্দ পাওয়া যায় । ভালবাসার টান এখনো তীব্র সেই মাটিতে রয়েছে ছোট বেলার নানা রকম সৃতি। সৃতিঘেরা স্থান সমূহের দিকে তাকালে সেই ছোট বেলার দৃশ্যপাট মনে পরে যায়। যত বয়সেই হোকনা কেন বাড়িতে গেলে মনে হয় বয়স কমে গেছে। তাই বাড়ি ফেরা মানে মাটির কাছে যাওয়া তাই ঘন্টার পর ঘন্টা ষ্টেশন বা টার্মিনালে দাড়িয়ে কষ্ট করে পাবিত্র ঈদে তিন বা চারদিনের জন্য বাড়ির পানে ছুটে মানুষ। সেখানে রয়েছে তারে বাবা মা কিংবা তাদের কবর, আছে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি, আরো আছে নিকটতম প্রতিবেশী,দূরবর্তী প্রতিবেশী,পাশাপাশি চলার সাথি।

তাই ইসলাম তাদের সাথে সদ্ধব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সাথে কাউকে শরীক করোনা। আর পিতামাতার সাথে সদাচরন কর এবং সদ্ধব্যবহার কর নিকটাত্মীয়,এতিম মিসকিন নিকটতম প্রতিবেশী,দূরবর্তী প্রতিবেশী,পাশাপাশি চলার সাথি,পথিক এবং তোমার অধিনস্ত দাস দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আত্মভিমানী এবং অহংকারীকে ভালবাসেনা’।(সূরা নিসা-৩৬)

ঈদে বাড়িতে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় ও দিন নির্ধারন করা প্রয়োজন। আর বৃহস্পতিবার সকালে বর হওয়া উত্তম। স্বাখর ইবনে আদ গামেদী (রা:) হতে বর্ণিত রাসুৃল(স.) বলেন,‘হে আল্লাহ তুমি আমার উম্মতের জন্য সকালে বরকত দাও’। আর তিনি যখন সেনার ছোট বাহিনী বা বড় বাহেনী পাঠাতেন তখন তাদেরকে সকাল রওয়ানা করতে বলতেন। স্বাখর ইবনে আদ গামেদী (রা:) ব্যাবসায়ি ছিলেন। তিনি তার ব্যবসার পন্য সকালেই প্রেরন করতেন এর ফলে তিনি এর বরকতে ধনী হয়ে গিয়েছিলেন এবং তার মাল প্রচুর হয়ে গিয়েছিল।( আবু দাউদ)

যাত্রা পথে বিভিন্ন রকম বিপদাপদ থেকে রক্ষার জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দোয়া পাঠ করা জরুরী। রাসুল (সা.) বলেছেন ‘যে ব্যক্তি এই দোয়া পরে ঘরথেকে বের হবে সকল বিপদ থেকে সে নিরাপদে থাকবে এবং ইবলিশ শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। দোয়াটি হল বিসমিল্লাহি তাওয়াককালতু আলাল্লাহি ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতাইল্লা বিল্লাহ অর্থ্যাৎ আমি আল্লাহর নামে আল্লাহর উপর ভরসা করছি আল্লাহ শক্তি ও সমর্থ ছাড়া কারো কোন ক্ষমতা নেই’।(তিরমিজী খন্ড-২ পৃষ্ঠা-১৮০)

ঈদে বাড়িতে যাওয়ার জন্য অবশ্যই যানবাহনে আরোহন করতে হয়। যানবহনে আরোহনের সময় কোন রকমের তাড়াহুড়া না করে ধীর গতীতে উঠা ঠিক নহে। তাই যানবাহনে উঠার সময় প্রথমে বিসমিল্লাহ পড়ে পা রেখে বসার পর আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয় এরপর আরোহনোর দোয়া পাঠ কারর পর তিনবার আলহামদুল্লিালাহ ও তিনবার আল্লাহু আকবর বলে সর্বশেষ এই দোয়া পড়তে হয়‘সুবহানাকা ইন্নি জলামতু নাফসি জুলমান কাছীরান ফাগফিরলি ইন্নাহু লাইয়াগফিরনিজ্জুনুবা ইল্লা আরতা”।(তিরমিজী)

রাসুল(স.) থেকে বর্ণিত,তিনি সাওয়ারীতে বসার পর যে দোয়া বলতে যেটি হলো ‘সুবহানাল্লাজি সাখখারালানা হা জা ওয়ামা কুননা লাহু মুক্করিনীন ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনক্কালিবুন।অথ্যাৎ মহান পবিত্র তিনি যিনি আমাদের জন্য এটাকে অধীন নিয়ন্ত্রিত বানিয়ে দিয়েছেন নতুবা আমরাতো এটাকে বশ করতে সক্ষম ছিলামনা একদিন আমাদেরকে আমাদের প্রভুর নিকট নিকট অবশ্যই ফিরে যেতে হবে’। (সূরা যুখরুফ-১৩-১৪)

নদীপথে ভ্রমনের সময়ে দোয়া পাঠ করতে হয়। হজরত নূহ (আ:) কে নির্দেশ করা হল যে,বেঈমানদের বাদ দিয়ে ঈমানদার নিয়ে নৌকার তুলে নিন। হজরত নুহ (আ:) উক্ত দোয়া করেন,‘বিসমিল্লাহি মাজরেহা ওয়ামুসাহা ইন্না রাব্বি লাগাফুরুর রাহিম অথ্যাৎ আল্লাহর নামেই এর গতি ও স্থিতি আমার পানলনকর্তা অতি ক্ষমা পরায়ন মেহেরবান’।(সূরা হুদ-৪)

ঈদে বাড়িতে যাওয়ার জন্য এককাকী বের না হয়ে সম্ভব হলে সাথে কাউকে নিয়ে বের হওয়া উত্তম এবং একজনকে নেতা বানিয়ে নেওয়া দরকার। আবু সাঈদ ও আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসুল(সা.) বলেন ‘যখন তিন ব্যক্তি সফরে বের হবে তখন তারা যেন একজনকে আমির বানিয়ে নেয়’।( আবু দাউদ)

ঈদে বাড়িতে যাওয়া জন্য কোন ব্যক্তি তার অবস্থানস্থল থেকে ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিেিলামিটার দূরে সফরের কিংবা বেড়াতে যাওয়ার নিয়তে তার এলাকা পেরিয়ে গেলেই শরিয়াতের দৃষ্টিতে সে মুসাফির হয়ে যায়(জাওয়াহিরুল ফিকহ১/৪৩৬) আর সে আকাশ পথে সফরের ক্ষেত্রে দূরত্বের হিসাব ও স্থল ভাগের সফরের দূরত্বের পরিমাপে হবে স্থলভাগের ৭৮ কি.মি.পরিমান দূরত্বের সফর হলে মুসাফির হবে’।(রদ্দুল মুহতার)

বাড়িতে যাওয়ার জন্য সফররত অবস্থায় নামাজের সময় হলে নামাজ আদায় করতে হবে আর সফরকারীর জন্য ইসলামে কিছু শিথিলতা রয়েছে মুসলিম শরীফের হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন,‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নবীর যুগে নামাজকে মুকিম অবস্থায় চার রাকাত ও সফর অবস্থায় দুই রাকাত ফরজ করেছেন’ তাই সফররত অবস্থায় নামাজ কসর করার কোন আপত্তি নেই। কসর হল (চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজ গুলো দুই রারাকত আদায় করা)। আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘তোমরাা যখন জমিনে সফর করবে তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় কোন আপত্তি নেই’।(সূরা নিসা-১০)

বাড়িতে যাওয়ার জন্য সফররত অবস্থায় নামাজের শিথিলতা রয়েছে তেমনি রোজার ও রয়েছে। বাড়িতে যাওয়ার পথে রোজা রাখতে অসুবিধা হলে কিংবা ভ্রমনে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা ও শারিরীক অসুবিধা হলে সে দিন রোজা না রেখে পরবর্তীতে কাজা আদায় করলে হবে। (বাদয়েউস সানায়ে-১/৯১)

আমরা যখন বাড়িতে যাওয়ার জন্য ভ্রমন করি তখন আমরা মুসাফির আর মুসাফিরদের দোয়া মহান আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। আবু আব্দুল্লাহ (রা:) হতে বর্নিত রাসুল (সা.) বলেন,‘তিনজনের দোয়া আল্লাহর দরবারে সন্দেহাতিতভাবে কবূল হয়। ১.নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া, ২.মুসাফিরের দোয়া, ৩.ছেলের জন্য পিতা মাতার দোয়া’।(আবু দাউদ-১৫৩৬)

ঈদে বাড়িতে গিয়ে সকলের সাথে দেখা সাক্ষাত করে যখন পূনরায় নিজস্থানে ফিরে প্রথমে নিকটবর্তী মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা উত্তম,কেননা সফরের বিভিন্ন বিপদ আপদ ও কষ্ট থেকে রক্ষা পেয়ে ফিরে আসা সম্ভব হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) সফর পানাহার ও নিদ্রা থেকে বিরত রাখে তাই ফিরা আসার জন্য শুকরিয়া আদায়ের নামাজ পড়া প্রয়োজন। হজরত কা’ব ইবনে মালেক (রা:) হতে বর্ণিত ‘রাসুল(স.) যখন সফর থেকে বাড়ি ফিরতেন তখন সর্ব প্রথম মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়তেন’।(বুখারী ও মুসলিম)

 

মো: আবু তালহা তারীফ
খতিব,রোহিতপুর বোডিং মার্কেট জামে মসজিদ.ঢাকা।
মোবা:০১৯২০৩৯১৭২৪

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

মাহফিলে কোরআন-হাদিসের রেফারেন্স বাধ্যতামূলক চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ

মোঃ আশরাফুল ইসলামঃ ধর্মীয় সভা ও ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতায় কাল্পনিক গল্প ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য নিষিদ্ধ …

error: Content is protected !!