কবি রুদ্র

কবিতার রাজপুত্র কবি রুদ্র এর ২৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী

আশির দশকের বাংলা কবিতার কবিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র সাতাশ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এবং রুদ্র ভক্তদের ২৭ তম দুঃখবার্ষিকী বলা যায় দিনটিকে।

প্রতিবাদী রোমান্টিক কবি হিসেবে তিনি খ্যাত।তিনি নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছিলেন শ্রমিক থেকে নির্যাতিত সকল শ্রেণীর মানুষের আত্মার সাথে।কবিতায় রুদ্রের ভাষা ছিল সকল মানুষের নীরব অভিমানে চাপা পড়ে যাওয়া আকুতিগুলোই।রুদ্র তার প্রতিটি কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন সমাজ ও মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি ও বাস্তব চিত্র।কবিতার রাজপুত্র কবি রুদ্রের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বাবার কর্মস্থল বরিশালে।

স্বল্পায়ু জীবনের অনেকটা সময় তিনি সংগ্রামী জীবন-যাপন করেছেন।সংগ্রামী জীবনে আধারের দেশে বসবাসরত অবস্থায় হয়ত আধারবাসীদের উৎসর্গ করে লিখেছিলেন,

যে আছে আলোয়,আছে তার রাতে ফেরার সম্ভাবনা,আছে যে আধারে,তার সামনেই উজ্বল আলোময় ফুটে ওঠবার অপেক্ষা নিয়ে রয়েছে রোদের কণা।

বুকে যন্ত্রণা পুষে লিখেছিলেন,

মানুষ আমি,যন্ত্র না,দিচ্ছ ভীষণ যন্ত্রণা।

তার শৈশব কেটেছে মংলা থানার সাহেবের মেঠ গ্রামে।দশ ভাই-বোনদের মধ্যে তিনিই সবার বড়। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পড়া ও কবিতা আবৃতির প্রতি তার আগ্রহ ছিল।খেলাধুলোর প্রতিও তার আগ্রহ কম ছিল না,কিশোর বন্ধুদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেন মংলার প্রথম ক্রিকেট দল।মামাতো ভাইদের নিয়ে নানীর ট্রাংক থেকে টাকা চুরি করে গড়ে তুলেন ‘বনফুল’ নামক লাইব্রেরি।

১৯৬৯ এর গণঅঅভ্যুত্থানে কিশোর রুদ্র যোগ দেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গণআন্দোলনের হরতাল,মিছিল,মিটিং সকল কর্মসূচিতে।১৯৭০ সালে রুদ্র ‘কালো টাইয়ের ফাস’ নাটকে অভিনয় করেন।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রুদ্র তখন নমম শ্রেণীর ছাত্র।অস্থির হয়ে ওঠেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য।তার বাবাকে পাক-সেনারা ধরে নিয়ে গেলে প্রথম সন্তান রুদ্রকে তার মা কিছুতেই যুদ্ধে যেতে দেন নি।যুদ্ধে যেতে না পারার কষ্ট সারাদেশে পৈশাচিক হত্যা-নির্যাতন তার ভাবনা জৎতকে তুমুলভাবে আন্দোলিত করে।বাবার স্বপ্ন ছিল রুদ্র ডাক্তার হবে,রুদ্রের ও স্বপ্ন ছিল তাই।কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তার স্বপ্নের ইচ্ছা বদলে যায়।

১৯৭২ সালের ২৬ নভেম্বর দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘আমি ঈশ্বর আমি শয়তান’ নামক তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়।


১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি বহুল আলোচিত নারীবাদী লেখিকা তাসলিমা নাসরিনকে বিয়ে করেন এবং ১৯৮৮ সালে তাদের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটে।

১৯৮৭সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের ভাড়াটে কবিদের এশীয় কবিতা উৎসবের প্রতিবাদে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন ‘মুক্তির জন্য কবিতা’শ্লোগান নিয়ে প্রথম ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’।স্বল্পায়ু  জীবনে তিনি সাতটি কাব্যগ্রন্থ, গল্প,কাব্যনাট্য এবং ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানসহ অর্ধশতাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন।১৯৮০ সালে তিনি মুনীরর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার অর্জন করেন।

জীবনের শেষের দিকে হয়তো খুব নিঃঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন বলেই রুদ্র লিখেছিলেন,

আমি একা,

এই ব্রক্ষ্মান্ডের ভেতর

একটি বিন্দুর মতো আমি একা।

১৯৯১ সালের ২১ জুন আজকের এই দিনে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এফ বাসায় সকাল সাড়ে সাতটায়  দাত ব্রাশ করার সময় sudden cardiac arrest এ আক্রান্ত হয়ে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া হয়ে যায়। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই জীবন্ত জীবনের সমাপ্তি ঘটে বাংলা কবিতার রাজপুত্র কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র।

না ফেরার দেশে ভাল থাকুক রুদ্র,কবিতায় আর রুদ্র প্রেমীদের অন্তরে রুদ্র বেচে থাকবে চিরকাল।

তানভির খান,নিউজ ঢাকা ২৪

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

নজরুলের জীবনের মতো নজরুলিয়ানদেরও সঠিক মূল্যায়ন হয়ত হবে না

  নিজ ঘরেই পরবাসি’ এই কথাটার বাস্তব উদাহরণ হতে পারে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!