করোনায় থাবায় ঘুড়ে দাড়াতে পারছে না কেরানীগঞ্জের কম্পিউটার এমব্রয়ডারী ব্যবসায়ীরা

দক্ষিন এশিয়ার সর্ববৃহৎ গার্মেন্টস পল্লী অবস্থিত কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ এলাকায়। কম্পিউটার এমব্রয়ডারী ব্যবসা এই গার্মেন্টস পল্লীর একটি অংশ। কয়েক বছর আগেও কম্পিউটার ব্যবসায়ীরা ভালো ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করলেও টানা দুই বছর করোনার ধাক্কায় পুজি হারিয়ে দিশেহারা কম্পিউটার এমব্রয়ডারী ব্যবসায়ীরা। পুজি হারিয়ে ঘুড়ে দাড়াতে পারছেন না তারা। ইতিমধ্যে অনেকেই সব কিছু হারিয়ে গুটিয়ে ফেলেছেন কারখানা।

প্রায় ১৩/১৪ বছর আগে কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ এলাকায় সীমিত পরিসরে কয়েকটি কম্পিউটার এমব্রয়ডারী কারখানা গড়ে ওঠে। এর পরে আস্তে আস্তে সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে এখানে প্রায় একশটির বেশি কারখানা রয়েছে। এখানে প্রায় ৩ শতাধিক কম্পিউটার এমব্রয়ডারী মেশিন রয়েছে। এই সকল কারখানায় কাজ করছে প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ শ্রমিক।

করোনা পরিস্থিতিতে টানা দুইবার লক ডাউনে কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে । এছাড়া ঈদ মৌসুমে মার্কেট বন্ধ থাকায় মার্কেট থেকে বাকি টাকা তুলতে না পারায় পুজি হারিয়ে পথে বসেছেন অনেক ব্যবসায়ী। বন্ধ হয়ে গেছে তাদের জীবন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। যারা টিকে আছেন তারাও কারখানা চালাতে অনেক হিমসিম খাচ্ছেন।

করোনা পরিস্থিতির আগে কম্পিউটার এমব্রয়ডারী কারখানাগুলোতে দুই শিফটে ১২ ঘন্টা করে দিনে রাতে হরদম কাজ হতো। সরগরম ছিলো এলাকা। এখনকার চিত্র সম্পূর্ন ভিন্ন।

সরেজমিন কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের নাগরমহল রোডে কম্পিউটার এমব্রয়ডারী কারখানাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, এক একটি কারখানায় ৩/৪টি করে মেশিন থাকলেও প্রায় সব কারখানায় একটি দুটি করে মেশিন বন্ধ রয়েছে। কোন কোন কারখানা ঈদের পরে খোলাও হয় নি। স্টাফ সংকট রয়েছে প্রতিটি কারখানায়। খবর নিয়ে জানা যায়, অনেক ব্যবসায়ী ধার দেনায় ডুবে মেশিন পত্র সব রেখেই লাপাতা হয়ে গেছে। কারখানায় উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট সুতা, টেপ, লাইলিং ইত্যাদি কাচামালের দাম হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যাওয়ায় কারখানা চালাতে প্রচন্ড বেগ পেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

কথা হয় ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, বৈশ্বিক মহামারীর কারণে অন্যান্য ব্যাবসার মতোই কম্পিউটারাইজড এমব্রয়ডারী ব্যাবসায় প্রচন্ড ক্ষতির সম্মুখীন। ব্যাবসায়ীদের বিনিয়োগকৃত অর্থ পাওনাদারদের নিকট থেকে আদায় করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে করোনার কারনে চায়না থেকে আমদানি বন্ধ ছিলো যার কারনে ম্যাটেরিয়ালে মূল্য ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি করোনার অযুহাত দিয়ে দেশে উৎপাদিত সুতাসহ অন্যান্য জিনিষপত্রের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে ম্যাটরিয়াল ব্যবসায়ীরা। খরচ বাড়লেও কাজের আর্থিক মুল্যায়ন বাড়েনি। মহামারীতে বির্পযস্ত অবস্থায় সরকারের প্রণোদনা সুবিধা পেলে এবং এমব্রয়ডারী কাজের মজুরির টাকা পরিশোধে অসততা দেখায় এমন অসাধু ব্যাবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নিলে সকল কম্পিউটারাইজড ব্যাবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলে সুদিন ফিরে পেতে পারেন।


অপর একজন ব্যবসায়ী হাজী শাওন জানান, আমরা সাধারনত পুরাতন ঢাকার ইসলামপুরের থ্রী পিস ও কালিগঞ্জের জিন্স প্যান্টের পকেটে কম্পিউটারের মাধ্যেমে এমব্রয়ডারীরর কাজ করে থাকি। আগে এ ব্যবসার চাহিদা থাকলেও এখন দিন দিন চাহিদা অনেক নেমে গেছে। সারা বছর ই আমরা বাকিতে কাজ করি। মোট কাজের ৫-১০% টাকা আমাদের মাসে মাসে মহাজনরা দিয়ে দেয়। বাকি টাকা হিসাব করে অর্ধেক রোযার সময় দেয় আর বাকি অর্ধেক রোজার পরে দীর্ঘ সময় নিয়ে চেকের মাধ্যমে দেয়। করোনার প্রথম বছর তেমন কাজ করতে পারি নি । ২য় বছর কাজ করলেও রমজান মাসে কোন টাকা পাই নি। মার্কেটে প্রচুর টাকা বাকি পরে আছে, উঠাতে পারছি না। বেচা কেনা থাকলেও মহাজনরা করোনার অযুহাত দেখায় । কারখানা চালাতে নুন্মতম খরচটাও আমাদের হাতে নেই। ব্যাংক থেকেও আমাদের লোন দেয় না সহজে। সব মিলিয়ে আমরা এক অন্ধকার পরিস্থিতিতে আছি।

ব্যবসায়ী মো: মোক্তার জানান, একদিকে মার্কেটে আমাদের প্রচুর টাকা বাকি রয়েছে। সে টাকা মার্কেট থেকে তুলতে পারছি না। ইসলামপুরে বেচা কেনা হলেও মহাজনরা করোনার অযুহাত দেখিযে আমাদের টাকা আটকিয়ে দিয়েছে। অন্য দিকে আমরাও কারখানার জমিদার, মেটরিয়ালসের দোকান, স্টাফদের কাছে বেতনের টাকা দেনা হয়ে আছি। আমরা মার্কেট থেকে যে টাকা পাই সেটার কোন খবর নেই। অন্য দিকে কারখানা মালিক চাপ দিচ্ছে বকেয়া ভাড়া না দিলে কারখানা বন্ধ করে দিবে। ম্যাটরিয়ালস দোকানদার বলছে আগের টাকা না দিলে ম্যাটরিয়ালস দিবে না। কর্মচারীরা বেতন না দিলে কাজ বন্ধ করে দিবে বলে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। আমরা মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে সহযোগীতা চাই। এই ব্যবসা দিয়ে আমাদের সংসার চলে, এই ভাবে চলতে থাকলে ব্যাবসা দ্রæত বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে বউ বাচ্চা নিয়ে খাবো কি ?

আগানগর কম্পিউটার এমব্রয়ডারী মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম টুমেল বলেন, কালিগঞ্জে ১০০টির বেশি কম্পিউটার এমব্রয়ডারী কারখানা রয়েছে। করোনার ধাক্কায় কম বেশি সকল ব্যবসায়ী নাজেহাল অবস্থা। মার্কেটে সবার প্রচুর টাকা বকেয়া থাকলেও ঠিকমতো কালেকশন করতে পারছে না। ঠিক মতো বেতন না দিতে পারায় অধিকাংশ কারখানায় ওর্য়াকার নেই। ফলে প্রোডাকশন না হওয়ার দরুন লস গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। মেটরিয়ালস ব্যবসায়ীরাও সিন্ডিকেট করে আমাদের বাকি দিচ্ছে না। সব মিলিয়ে বাজে একটা পরিস্থিতি যাচ্ছে আমাদের।

এদিকে ব্যংক থেকেও আমাদের লোন দিতে চায় না। অন্যান্য সেক্টরে আমাদের চেয়ে ছোট ব্যাবসায়ীদের লোন দেয়। অথচ আমাদের ইনভেস্ট বেশি, মার্কেটে অনেক টাকা বাকি পরে থাকে তার পরেও কোন ব্যাংক আমাদের লোন দিতে চায় না। সরকারের কাছে অক‚ল আবেদন আমাদের যেন ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। তা হলে ইন সা আল্লাহ সব লসের ধাক্কা কাটিয়ে আমরা আবার ঘুড়ে দাড়াতে পারবো। #

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

শাহীন আহমেদ

শেখ রাসেল বেচে থাকলে দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতো : শাহীন আহমেদ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। তার যোগ্য কন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা …

error: Content is protected !!