অগ্নি নির্বাপন

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীর অধিকাংশ দোকানেই নেই কোন অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা !

ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী অগ্নিকান্ডের জন্য অত্যন্ত ঝুকিপূর্ন একটি এলাকা। এখানে রয়েছে প্রায় ৮ হাজারের মতো সো রুম এবং ৫ হাজারের মতো পোষাক তৈরীর কারখানা। কিন্তু কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীর বেশিরভাগ সোরুমে নেই কোন অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা।

অধিকাংশ ভবনে নেই জরুরী নির্গমন পথ। কিছু কিছু স্থানে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তারই সামপ্রতিকতম নমুনা কালীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীর নুরু মার্কেটে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় প্রায় ১০০টি দোকান পুড়ে ছাড়খার।

*) ৮ হাজার সোরুমের অধিকাংশে নেই নুন্মতম একটি অগ্নিনির্বাপক সিলেন্ডার
*) একাধিক বার স্থানীয় সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তাগিদ দেয়া হলেও তেমন ব্যবস্থা গৃহীত হয় নি
*) অধিকাংশ ভবনেই মানা হয় নি কোন বিল্ডিং কোড
*) এখনই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না গ্রহন করলে ভবিষ্যতে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে আগানগর ইউনিয়ন ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছে কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী। জনবহুল ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় এ এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যান্ত খারাপ। যার কারনে ফায়ার সার্ভিসকেও আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়।

স্থানীয় অনেকেই জানান, প্রায় ৩৫-৪০ বছর আগে গড়ে ওঠা গার্মেন্টস পল্লী একটু একটু করে এখন অনেক বড় হয়েছে। তবে সেই সাথে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থার দিকে তেমন নজর দেয়া হয় নি। স্থানীয় সাংসদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের বার বার তাগিদ দেয়ায় ফলে কেউ কেউ অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব আরপ করলেও অধিকাংশ ভবন ও সোরুম মালিকেরা এখোনো অগ্নি নির্বাপক কোন নিয়ম মানছেন না।

সরেজমিন কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টস পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ দোকানেই নেই অগ্নি নির্বাপনের জন্য নুন্মতম একটি গ্যাস সিলেন্ডার। গার্মেন্টস পল্লীর রাস্তাঘাটগুলোও অনেক সরু ও ঘিঞ্জি ফলে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে অনেক বেগ পেতে হবে। এছাড়া ভবন মালিকেরা কোন প্রকার বিল্ডিং কোড না মেনে যে যার মতো বিল্ডিং নির্মান করেছে। হঠাৎ দুর্ঘটনায় বিকল্প কোন রাস্তা, আগুন নিভানোর পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা কিছুই নেই এখানে। ট্রান্সফর্মার গুলোও যেখানে সেখানে বসানো হয়েছে। ফলে যে কোন সময় বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি মার্কেটে সার্বক্ষনিক ভাবে যারা থাকেন, এমন কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যে অগ্নি নির্বাপন বিষয়ে কোন প্রশিক্ষন নেই। তাৎক্ষনিক কি ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে সেই সম্পর্কেও ধারনাও নেই তাদের।

আলম মার্কেটের হাওলাদার ফ্যাশনের মালিক আবু তাহের বলেন, আমার দোকানে ২ টা গ্যাস সিলেন্ডার আছে। কিন্তু আমার আশে পাশের কোন দোকানেই তো নেই। আল্লাহ না করুক বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সবার পাশাপাশি আমিও তো বিপদে পড়বো। অথচ প্রতিটা দোকানে যদি ১ টা করে গ্যাস সিলেন্ডার থাকে তা হলে অগ্নিকান্ডের ঘটনা প্রাথমিক ভাবে অনেকটা নির্মূল করা সম্ভব। একটা সিলেন্ডারের দাম মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তারপরেও অধিকাংশ দোকানদার ই এটা কিনতে চায় না।

কেরানীগঞ্জ গ্রাজুয়েট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজসেবক ম.ই মামুন বলেন, গার্মেন্টস পল্লীর ব্যবসায়ীদের আরো সচেতন করতে হবে। আগে এগিয়ে আসতে হবে জমিদারদের। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস মালিক সমিতিকে আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নিয়ে তাদের আরো গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। গার্মেন্টস মার্কেট ও গার্মেন্টস পল্লীকে ঢেলে সাজাতে হবে।

আগানগর ইউনিয়নের সমাজসেবক কালিম সান্টু বলেন, কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন একটি স্থান হলেও এখানকার মার্কেটগুলোতে নেই যথাযথ অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা, এমনকি টয়লেটের ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই। এখানকার জিলা পরিষদ মার্কেটটিও অত্যন্ত ঝুকিপূর্ন। খালের ওপর দুইতলা ভবনকে এখন তিনতলা করা হয়েছে। অপরিকল্পিত ভাবে হওয়ায় যে কোন সময় এখানে ঘটতে পারে বড়ো অগ্নিকান্ডের ঘটনা। এখানে ফায়ার এলাম পর্যন্ত নেই। প্রতিটি দোকানে অন্তত একটি করে অগ্নি নির্বাপনের জন্য গ্যাস সিলেন্ডার থাকা প্রয়োজন। যে সকল দোকানে সিলেন্ডার আছে তারাও সঠিক ভাবে এর ব্যবহার জানে না।। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমিতি কর্তৃপক্ষ অগ্নি ঝুকি এড়াতে তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে নি।

গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমিতির উচিত ব্যবসায়ী ও গার্মেন্টস পল্লীর স্বার্থে অগ্নি ঝুকির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা, দায়িত¦ নিয়ে কাজ করা। ফায়ের সার্ভিসের লোকজনদের ডেকে, অগ্নি নির্বাপক মহড়ার ব্যবস্থা করা উচিত, প্রতিটি মার্কেট ও দোকানে অগ্নি নির্বপক ব্যবস্থার জন্য বিশেষ ভাবে জোড় দেয়া উচিত তাদের। এছাড়া প্রতিটি ট্রান্সফর্মারে বিদ্যুতের লুজ কানেকসন সমস্যার ও সমাধান করা উচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা মো: আবুল খায়ের বলেন, কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী অবশ্যই আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। ২০ বছর আগেও এখানে এতো জমজমাট ছিলো না। এখন তো মহল্লার বাড়ি ঘর ঘেষেই নির্মন করা হচ্ছে গার্মেন্টস ও সোরুম। তবে দু:খের বিষয় দেশে নানা জায়গায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা দেখার পরেও এখানকার ব্যবসায়ীদের শিক্ষা হচ্ছে না । তারা অগ্নিকান্ডের বিষয়টা মাথায় ই নিচ্ছে না। এখন ই এ বিষয়ে সু দৃষ্টি না দিলে ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতি দেখতে হতে পারে আমাদের।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ দোকান মালিক ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারন সম্পাদক মুসলিম ঢালী বলেন, প্রতিটা দোকানে দোকানে গ্যাস সিলেন্ডার আছে। আমরা প্রতিটা দোকানে নোটিশ করেছি, মাইকিং করেছি। আমরা প্রতিটি ফ্যাক্টরোতে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। যেহুতু এটা একটা বড়ো ব্যবসায়ী এড়িয়া সব কিছু করতে সময় লাগে। আগে অগ্নি নির্বাপকের কিছুই ছিলো না। আমরা ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীদের সচেতন করেছি। ব্যাবসায়ীরা এখন অনেক সচেতন।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস মালিক সমিতির সভাপতি স্বাধীন শেখ বলেন, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা নিয়ে আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। আমরা মার্কেটের প্রতিটি তালায় বালি , হোস পাইপ সহ নানান ব্যবস্থা গ্রহন করেছি। ভবিষ্যতে আবার যেন বড় কোন দুর্ঘটনা না ঘটে সেই লক্ষে আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, এখানে দীর্ঘদিন ধরেই অপরিকল্পিত ভাবে ভবন হয়ে উঠেছে। দোকানগুলোতে একটা অগ্নি নির্বাপক সিলেন্ডার পর্যন্ত রাখতে চায় না তারা। মাননীয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ থেকে বারবার ব্যবসায়ী ও ভবন জমিদারদের সাথে কাউন্সিলিং করা হলেও এরা বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না। অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নিয়ে বার বার মিটিং করার পরেও কিছু জমিদার বিষয়গুলো পালন করলেও অধিকাংশ জমিদার ও দোকান মালিক করছি করছি বলে অবহেলা করছে, আমাদের কথা কর্নপাত করছে না। এবার আমরা সিন্ধান্ত নিয়েছি ফায়ার সার্ভিস ও অগ্নি নির্বাপন সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে একসাথে নিয়ে আমরা একটা এ্যাকশন প্লান তৈরী করছি এবং দ্রুতই তা শুরু করবো।#

আরো পড়ুন: কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীতে ভয়াবহ আগুন।

নিউজ ঢাকা ২৪

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চাঁদাবাজির প্রতিবাদে অবস্থান ও বিক্ষোভ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী আড়তে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চাঁদাবাজির প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকেরা। …

error: Content is protected !!