ভাতার টাকা

কেরানীগঞ্জে ডিজিটাল মারপ্যাঁচে ভাতার টাকা নয় ছয়ের অভিযোগ

সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক গরীব অসহায়দের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ব্যাংক একাউন্টের পরিবর্তে মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট নগদের মাধ্যমে দেয়ার সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কেরানীগঞ্জেও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে গত মে মাস থেকে। তবে নানান জটিলতার কারনে ভাতার টাকা সংগ্রহ করতে পারছেন না অধিকাংশ অসহায় জনসাধারন। পূর্বে সহজেই ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা উঠাতে পারলেও, বর্তমানে ডিজিটাল মারপ্যাঁচে ভাতার টাকা উঠাতে নানান জটিলতা পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই গত কয়েকমাস ধরে দাড়ে দাড়ে ঘুড়েও সংগ্রহ করতে পারছে না ভাতার টাকা। এতে করে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অসহায় দরিদ্র ও ভাতার টাকার ওপর নির্ভরশীল জনসাধারনদের।

কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকার বাসিন্দা অসহায় হাওলাদার রওশন আলী। গত তিন বছর ধরে নিয়মিত ব্যাংকের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা পেয়ে আসছিলেন তিনি। তবে গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে ভাতা পাচ্ছেন না তিনি। এ জন্য তিনি কেরানীগঞ্জ সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলছে আমার টাকা কোন একটা নম্বরে ভুলের কারনে নাকি আমি এতদিন পাই নাই । এখন আর আমার টাকা দেয়া হবে না। পরবর্তীতে আবার বাজেট হলে নতুন করে দেয়া হবে। আমার গেল ৬ মাসের টাকা আমি পেলাম না। অথচ এই টাকাটা দিয়ে আমি প্রতিমাসে ঔষধ কিনে খাই।

আমবাগিচা খালপাড়ের বাসিন্দা মো: ইউনুস মিয়া, তার বয়স্ক ভাতার ৬ মাসের তিন হাজার টাকা চলে গেছে জামালপুরের এক ব্যাক্তির কাছে। তার টাকা আরেক জনের নাম্বারে কিভাবে গেলো সেটা ইউনুস মিয়ার জানা নেই। যে নাম্বারে গিয়েছে ঐ ব্যাক্তিও অস্বীকার করছে। কয়েকবার নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদে দৌড়াদুড়ি করলেও টাকার কোন সুরাহা করতে পারেন নি তিনি। সমাজ সেবা অফিস থেকে বলা হয়েছে এই টাকার ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই। তবে পুরাতন নাম্বারটি কেটে নতুন নাম্বার রেখে দিয়েছেন তারা, পরবর্তীতে আর সমস্যা হবে না এমনটা আশা দেয়া হয়েছে ইউনুস মিয়াকে।

একই সমস্যা তেঘরিয়ার মনরা বেগমের। ভাতার টাকা না পেয়ে তিনি যোগাযোগ করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ে। তিনি জানতে পারেন তার ভাতার ৬ মাসের ৩০০০ টাকা চলে গিয়েছে অন্য কোন এক নাম্বারে। ২ মাস আগে নগদ একাউন্ট করার সময় যে নম্বরটি মনরা দিয়েছিলেন, সে নাম্বারে টাকা না এসে অন্য আরেকটি নাম্বারে কিভাবে টাকা গেলো সেটা মনরা জানেন না। সমাজসেবা অফিস, তেঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ, নগদ অফিস ঘুরেও এই ভুল নাম্বারের কোন ব্যাখা পান নি তিনি। থানায় একটি জিডিও করেছেন এ বিষয়ে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও টাকার কোন সুরাহা করতে পারেন নি মনরা বেগম।

শুভাঢ্যার সাফিয়া বেগম গেল কয়েকদিন ধরে যাওয়া আশা করছেন নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদে ও উপজেলা সমাজ সেবা অফিসে। তিনিও গেল ৬ মাস যাবৎ টাকা পাচ্ছেন না। তার টাকা তার মুঠোফোনোর নগদ একাউন্টে চলে এসেছে। কিন্তু এই টাকা দেখবেন কিভাবে বা টাকাটা তুলবেন কিভাবে সেটা তার জানা নাই। তিনি তার নগদ একাউন্টের পিন নম্বরটি জানেন না। তিনি দাবী করছেন সমাজ সেবা অফিসের যারা তাকে নগদ একাউন্ট খুলে দিয়েছিলো তারা তাকে পিন নম্বরটি বলে নি। এখন তাকে গুলিস্তান নগদের কাষ্টমার কেয়ারে যেতে বলেছে। অসুস্থ সাফিয়া বেগম গুলিস্তানে কোথায় গিয়ে অফিসে খুজবেন, কার কাছে যাইবেন, কি করবেন কিছুই তার বুঝে আসছে না।

কালন্দির নুরু মিয়ার টাকাও চলে গিয়েছে ভুল নগদ নাম্বারে। সমাজসেবা অফিস আর নগদ অফিসের লোকজন যখন নগদ নাম্বার সংগ্রহ করতে এসেছিলো তখন তিনি যে নাম্বার দিয়েছিলেন সেটার সাথে যে নাম্বারে টাকা গেছে তার শেষের দুই ডিজিট ভুল আছে। নুরু মিয়া বলেন, আমি কয়েকবার আমার নাম্বারটি তাদের বলেছি। পুনরায় চেক করতে বলেছি। তারা আমাকে আসস্ত করেছিলো নাম্বার ঠিকঠাক দিয়েছে তারা কিন্তু এখন টাকা আনতে গিয়ে দেখি নাম্বার ভুল বসিয়েছে তারা। আর এর দায় তারা নিতেও চাচ্ছে না। আমি কি আমার নিজের নাম্বার ভুল বলবো বলেন ? যে নাম্বারে টাকা গেছে ঐ লোক ও কল ধরছে না।

সরেজমিন কেরানীগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন ঘুড়ে দেখা যায়, এমন অহরহ সমস্যা প্রতিটি ইউনিয়নেই বিদ্যমান রয়েছে। প্রতিদিন ই ইউনিয়ন পরিষদে ভীড় করছে ভাতা না পাওয়া লোকজন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের নগদ পিন নম্বরটি জানেন না। কারো কারো মোবাইল নম্বর ভুল উঠানো হয়েছে। কারো কারো ২/১ টা ডিজিট ভুল উঠেছে। কারো কারো অন্য অপরিচিত নাম্বারে টাকা চলে গেছে। বেশিরভাগের টাকা অন্য নাম্বারে ভুলে চলে যাওয়ার কারনে গত ৬ মাসের ভাতা বঞ্চিত হয়েছে ভাতাভোগকারীদের বড় একটা অংশ। আর এই ভুলের দায় সমাজ সেবা অফিস বা স্থানীয় নগদ কতৃপক্ষ কেউ নিতে চাইছে না। তারা একে অপরকে পাল্টা পাল্টি দোষারোপ করছে।

স্থানীয় কয়েকজন জনসাধারনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আগে ভাতার টাকা ব্যাংকে দেয়া হতো, সেটাই ভালো ছিলো। এখন ডিজিটাল করাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা যারা নেয়, তাদের অনেকের মোবাইল ফোন নেই, নেই নগদ একাউন্ট, টাকা সংগ্রহের জন্য তাদের তৃতীয় পক্ষের আশ্রয় নিতে হয় এটা একটা অসুবিধা। অনেকেই নগদের পিন নাম্বার কি সেটা যানে না এটা একটা সমস্যা। এছাড়া যারা এই ভাতা সুবিধা ভোগকারীদের একাউন্টগুলো খুলে দিয়েছে তারা কাজের সময় খামখেয়ালী করেছে। ঠিক মতো কাজ করে নি বিধায় ই নাম্বারগুলো উল্টা পাল্টা হয়েছে। দুই একটা ভুল হয়তো মেনে নেয়া যায়, কিন্তু অধিকাংশ নাম্বারেই ভুল এটা মেনে নেয়া কষ্টকর। এখানে অন্যকোন বিষয় আছে কিনা সেটা ভাবার বিষয়। কতৃপক্ষের খামখেয়ালির জেড় দিচ্ছে সাধারন অসহায় জনগন।

নগদ কর্তৃপক্ষ কি বলছে ?

কেরানীগঞ্জের নগদের পার্টনার রিলেশনসীপ অফিসার (পিআরও) সৈয়দ গোলাম মোর্শেদ বলেন, সম্পূর্ন নাম্বার ভুল অথবা ডিজিট ভুল যাই হোক না কেন, এর দায় স্থানীয় সমাজ সেবা কার্যালয়ের লোকজনের এখানে নগদের বা নগদের কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র ভুল নেই। তারা আমাদের যে নাম্বারগুলো দিয়েছে আমরা ঐ নাম্বারের নগদ একাউন্ট আপডেট করেছি । আমাদের ২০ জন স্টাফ দুইমাস পরিশ্রম করে কেরানীগঞ্জে ২৭ হাজার ভাতা সুবিধাভোগীর মধ্যে ২০ হাজার সুবিধা ভোগীর নগদ সিস্টেম চালু করে দিয়েছে। সমাজ সেবার লোকজন যেভাবে চেয়েছে আমরা ঐ ভাবেই কাজ করেছি। তবে বাকি ৭ হাজার লোকের ইনফরমেশন সমাজ সেবার লোকজন সংগ্রহ করেছে। আমাদের ২০ হাজার লোকের কাজ টা করতে সময় লেগেছে ২ মাস । আর তারা কয়েকজন মিলে বাকি ৭ হাজার লোকের তথ্য ৪/৫ দিনে কিভাবে আপডেট করলো তা আমাদের জানা নেই।

সমাজ সেবা কতৃপক্ষ কি বলছে ?

কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার মো: ফখরুল আশরাফ বলেন, নাম্বার ভুলের দায় সম্পূর্ন নগদ কতৃপক্ষের। মাঠ পর্যায়ে তাদের যে দায়িত্বটি দেয়া হয়েছিলো তা তারা ঠিক মতো পালন করেন নি। তারা ঠিক মতো কাজ করে নি বিধায় ই আজকে এতো সমস্যা। তাছাড়া তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে অদক্ষ লোক দিয়েছিলো। তাদের অদক্ষতার কারনেই এতো ভুল হয়েছে। আর তারা ২২ হাজার লোকের তথ্য ২ মাসে আপডেট করেছে। বাকিগুলো সমাজ সেবা অফিসের লোকজন ২৫ দিন সময় নিয়ে করেছে । ভুলের বিষয়ে সম্পূর্ন দায় দায়িত্ব নগদ কতৃপক্ষের।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ বলেন, এমন কয়েকটা অভিযোগ আমিও পেয়েছি। ভুলটা কোথায় হচ্ছে তা খুজে বের করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে উদ্দ্যোগ তা নস্যাৎ করতে যদি কোন চক্র কাজ করে থাকে তাহলে তাদের প্রতিহত করতে আইনী পদক্ষেপসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তার আগে আমাদের খুজে বের করতে হবে। টেকনিক্যাল কোন ভুল হয়ে থাকলে তা সলভ করার চেষ্টা করা হবে। আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করলে তার বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এ বিষয়ে আপনাদের সকলের সহযোগিতা দরকার। #

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

করোনায় থাবায় ঘুড়ে দাড়াতে পারছে না কেরানীগঞ্জের কম্পিউটার এমব্রয়ডারী ব্যবসায়ীরা

দক্ষিন এশিয়ার সর্ববৃহৎ গার্মেন্টস পল্লী অবস্থিত কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ এলাকায়। কম্পিউটার এমব্রয়ডারী ব্যবসা এই গার্মেন্টস পল্লীর …

error: Content is protected !!