মারুফ আশ্রয়কেন্দ্রে,চিত্র পাল্টায়নি পুরান ঢাকার বাকি পথশিশুদের

 অপূর্ব চৌধুরী: পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক ও সদরঘাট এলাকায় পথশিশুদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এসব পথশিশুরা ফেলে দেওয়া খাবারে তাদের ক্ষুধা মেটায় এবং রাত্রি যাপন করে ফুটপাত কিংবা বিভিন্ন পার্কে। পথশিশুদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অপরাধীচক্র তাদেরকে প্রতিনিয়ত জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি, মাদক বহন ও সেবনসহ নানা অবৈধ কাজে বাধ্য করছে।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত এলাকায় সরকার ঘোষিত লকডাউন পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ধারাভাষ্যের এক পর্যায়ে সেখানে ঢুকে লকডাউন নিয়ে প্রশ্ন তুলে মারুফ নামের এক পথশিশু। মুহূর্তেই সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়৷ পরবর্তীতে সেই পথশিশুকে খোঁজে না পাওয়া,মারধর করাসহ বিভিন্ন গুঞ্জন শোনা যায়। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হলে আদালতের আদেশের ভিত্তিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মিরপুর আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।তবে মারুফকে পরিস্থিতি অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হলেও বাহাদুর শাহ পার্কের বাকি পথশিশুদের দুর্দশার চিত্র পাল্টায়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ১০-১৫ জন পথশিশু বাহাদুর শাহ পার্কের বিভিন্ন স্থানে বসেই ড্যান্ডি (মাদকদ্রব্য) নিচ্ছেন।কেউ বা আবার ঘুমিয়ে আছেন ছেঁড়া জামা কাপড় গায়ে।

পার্কে অবস্থানরত পথশিশু হৃদয় জানায়,আব্বা মারা যাওয়ায় মা অন্যজনকে বিয়ে করেছে। মোহাম্মদপুরে থাকে তারা। মা যেতে বলে কিন্তু আমি গেলে সৎ বাবা আমাকে আর মাকে মারে। তাই সেখানে যাইনে। ছোট বেলা থেকেই আমি এখানে ভিক্ষা করি। সুযোগ পেলে চুরিও করি। চুরি না করলে ওরা (চক্র) আমাকে মারে। কিন্তু লকডাইনে আগের মতো ভিক্ষা নেই। তাই খাবারও নেই। পার্কে লোক আসে না তাই না খেয়েই পার্কে ঘুমাতে হয়। রাতে আমার খুব কষ্ট হয়। ঘুমাতে পারিনা।

হৃদয় আরও জানায়, চুরির পেশা বাদ দিতে চায় সে। কিন্তু চুরি বাদ দেয়ায় কেরাণীগঞ্জের মামুন (২৫) নামের এক ব্যক্তি তার পায়ুপথে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছুড়িকাঘাত করে। তাকে জোড় করে মহিলাদের ব্যাগ থেকে চুরি করানো হয়। করানো হয় মাদকাসক্ত। পাশেই কমবয়সী একটি মেয়ের (৫) হাতে ড্যান্ডির প্যাকেট। নাম জিজ্ঞেস করতেই দৌড়ে পালায় সে। কি কারণে মাদক সেবন করছে মেয়েটি নিজেও জানে না বলে জানায় হৃদয় ।

অপরদিকে গুলিস্তানের এক মাদ্রাসা থেকে পার্কের কয়েকজন মহিলা ও কেরাণীগঞ্জের কয়েকজনের সম্মিলিত একটি চক্র ভুলিয়ে ভালিয়ে আনে সজলকে (৮)। তাকে প্রথমে মাদক দ্রব্য ড্যান্ডি খাওয়ানাে শেখায়। এরপর জোর করেই তাকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ও চুরি করানাে হয়। কিন্তু লকডাউনে ভিক্ষাবৃত্তিতে তেমন রোজগার নেই বলে তাকে মারধর করা হচ্ছে বলে জানায় সজল।

জানা যায়, পুরান ঢাকার নান্দনিক স্থাপনার নিদর্শন বাহাদুর শাহ পার্কে বর্তমানে ৩০-৩৫ জন ভাসমান শিশু-কিশাের আছে। উদ্বাস্তু এ পথশিশু ও কিশােররা পার্কের আশেপাশে চকলেট, ফুলের মালা, প্লাস্টিক বিক্রি করত। এছাড়া সবার কাছে হাত পেতে করত রােজগার। সুযােগ পেলে তারাই আবার মোবাইল, ব্যাগ, কালের দুল বা গলার হার ছিনতাই করে পালাত। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিনিময়ে এসব শিশু-কিশোররা তাদের চক্র থেকে পেত খাবার ও ড্যান্ডি।

কিন্তু লকডাউনে বর্তমানে পার্কের পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই চক্র থেকে খাবারও পায়না এখন তারা। ইফতারের সময় যদি কোন ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খাবার নিয়ে আসে শুধুমাত্র তাহলেই সারাদিনে একবেলা খেতে পায় এ পথশিশুরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনােবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক ডিন ড. কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এ পথ শিশুরা সোস্যাল ব্যাহিভার ও ক্রিমিনাল ব্যাহিভার বুঝে না। তারা মাদক সেবন ও চুরিকে অপরাধ হিসেবে মনে করে না। মাদক সেবনের কারণে তারা মানষিকভাবে ভারসাম্যহীন থাকে। তারা চুরির মত ছােট ছােট অপরাধ করতে করতে একসময় বড় সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। অনেক রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হয়। তাদের জন্য প্রয়োজন যথাযথ পুর্নবাসনকেন্দ্র।

লালবাগ জোনের এডিসি হাফিজ আল আসাদ বলেন, পথশিশুদের নিয়ে মূলত কাজ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়। তাদেরকে পুর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানাে হলেও তারা আবার ফিরে আসে। তবে আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পূর্ণবাসনের জন্য পথ শিশুদের একটি ডাটা কালেকশন করছি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

লালপুরে সাংবাদিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

নাটোরের লালপুরে দিনব্যাপী সাংবাদিকতায় বুনিয়াদি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) উপজেলার গ্রীন ভ্যালি পার্কে …

error: Content is protected !!