ভাসমান ভারসাম্যহীনদের দায়িত্ব কে নিবে?

ভাইরালে ভাগ্য ফেরে! এমন আপ্তব্যাক্যে হয়তো সামনের দিনগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর কিছু নমুনা এরই মধ্যে দেখাও গেছে। কোনো মানুষের অসহায়ত্ব গণমাধ্যমে আলোচনায় আসলে নানা উদ্দেশ্য নিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখা যায় অনেককেই। কিন্তু যারা আলোচনার বাইরে থেকে যায়; তাদের ভাগ্যে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো কি ধরা দেবে? কেউ কি দায়িত্ব নিবে এসব ভাসমান মানসিক ভারসাম্যহীনদের?
গতকয়েক মাসের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতলের সামনে ময়লা-দুর্গন্ধ মেখে অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে শুয়ে এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি। এই ব্যক্তিকে এইভাবেই আরো দুই দিন পড়ে থাকতে দেখা যায়। সে সময় কয়েক ব্যক্তিকে তার পাশে টাকাও ফেলতে দেখা যায়। কিন্তু তিনি নির্বিকার শুয়েই ছিলেন।
আবার নগর ভবনের দ্বিতীয় গেটের সামনে ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পোশাকে অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখা যায় মানসিক ভারসাম্যহীন অজ্ঞাত এক নারীকে। ঘনকুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডার মাঝে খোলা আকাশের নিচেই জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকে এ নারী।

এমনই আরেকজন অজ্ঞাত নারীকে রাজশাহী প্রাথমিক শিক্ষা রাজশাহী বিভাগীয় উপ-পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতের এক কোণে ছোট্ট খুপরি ঘরে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। যাকে নিয়ে ১১ জানুয়ারি ‘মায়ের জায়গা হয়েছে ফুটপাত, ফিরতে চাই ঘরে’ শিরোনামে সোনার দেশ পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, রাজশাহী নগরীতে ত্রিশ এর অধিক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে এভাবেই মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে নারীও আছেন। সারাদিন শেষে ময়লা দুর্গন্ধ শরীরে রাতে কখনো ফুটপাত, কখনো রাস্তায় ঘুমাতে দেখা যায় তাদের। তাদের এমন জীবনযাপনের সঙ্গী হতে দেখা গেছে পথের কুকুর-বিড়াল।

পরিষ্কার-পরিছন্নতা সর্ম্পকে ধারণাহীন এসব মানসিক প্রতিবন্ধীদের এড়িয়ে যেতেই দেখা গেছে পথযাত্রীদের। আবার কিছু বিবেক-বোধসম্পন্ন মানুষ ওইসব ভবঘুরে মানুষদের খাবারসহ শীতকালিন সময়ে গরম কাপড় দিয়ে সহযোগিতা করতেও দেখা গেছে। পুলিশবাহিনীকেও সাহায্যের হাত বাড়াতে দেখা গেছে। সাহায্যকারীরা মানসিক ভারসাম্যহীন এই মানুষদের নিরাপদ জায়গায় রেখে চিকিৎসা করানোর জন্য সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে, রাজশাহী মানসিক প্রতিবন্ধী যারা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় তাদের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা তথ্য নেই সমাজসেবা অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, রাজশাহী সিটি করপোরেশন কিংবা পুলিশের কাছে। রাজশাহী সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাসিনা মমতাজ জানান, এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো পরিসংখ্যান নেই। মানসিক ভারসাম্যহীন যারা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এদের জন্য নির্দিষ্টভাবে আলাদা কোনো কর্মসূচিও নেই। তবে নারী ও শিশুদের জন্য বায়ায় একটি সেফ হোম রয়েছে। যেখানে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সেবা দেয়া হয়। এসব ভবঘুরেদের সেখানে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এরই মধ্যে সেখানে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুন ভর্তি আছে। আর এখানে যারা আসে সবাই আদালতের নির্দেশে আসে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্তজার্তিক বিষয়ক সম্পাদক রেখা সাহা জানান, বিষয়গুলো খুবই দুঃখজনক। রাস্তায় যেসব মানসিক ভারসাম্যহীন ঘুরে বেড়ায় এদের মধ্যে নারী রয়েছেন। নিজেকে সেই জায়গায় বিবেচনা করলে গা শিউরে ওঠে। কেননা তারা একদিকে যেমন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি তাদের প্রতি যদি কোনো অন্যায় হয় তার প্রতিবাদও তারা করতে পারবে না। কেননা সেই বোধও তাদের নেই।
তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে অবশ্যই সরকারে কর্মসূচির প্রয়োজন। যেখানে তারা সেইফ থাকবে। এছাড়া এমন লেবাস ধরে অনেকে মাদক ব্যবসাসহ অন্য অপরাধেও জড়িত থাকতে পারে।

এ বিষয়ে রাজশাহী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরিফুল হক জানান, রাজশাহী জেলা প্রশাসনের কাছে এদের কোনো ডাটা নেই। তবে এমন মানসিক প্রতিবন্ধী ও ভবঘুরে যারা আছে তাদেরকে মাঝে মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। শীতকালিন কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি নেই।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরিফ উদ্দিন জানান, রাসিকের পক্ষ থেকে এসব ভবঘুরে বা মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো কর্মসূচি নেই। সমাজসেবা এদের নিয়ে কাজ করে।

এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম রুহুল ক্দ্দুুস জানান, রাজশাহীতে মানসিক ভারসাম্যহীন যেসব মানুষ ভাসমানভাবে রাস্তাঘাটে অমানবিক জীবনযাপন করে এদের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে তাদের জায়গা থেকে তারা এসব মানুষদের সাহায্য করে থাকেন। আর এদের কেউ যদি কখনো নির্যাতনের শিকার হন তখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তিনি আরো জানান, অনেক আগে এরকম ঘটনা ঘটেছিল। মানসিক ভারসাম্যহীন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পরে যখন গর্ভবতী হয়েছেন তখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন এ রকম ঘটনা নেই। তিনি জানান, এসব মানুষদের পুনর্বাসনসহ অন্যান্য যে কোনো প্রয়োজনে জেলা প্রশাসন কিংবা স্থানীয় প্রতিনিধিরা কেউ যদি তাদের সহযোগিতা চান তাহলে তারা সহযোগিতা করবেন।#

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

কেরানীগঞ্জে দূর্বৃত্তের অতর্কিত হামলায় গোয়েন্দা পুলিশ আহত

ঢাকার কেরানীগঞ্জে দূর্বত্তের অতর্কিত হামলায় মো: ইমাম হোসেন (৩৪) নামে এক গোয়েন্দা পুলিশ আহত হয়েছে। …

error: Content is protected !!