টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের নামে প্রতারণা, ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রতারক

জহিরুল ইসলাম মিলন: এক লাখ টাকা দিলে ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের’ আওতায় দুই লাখ টাকা মূল্যের ফ্লোর পাকা ঘর পাবেন- এই আশায় বছরখানেক আগে ৪০ হাজার টাকা দিয়েছেন ফিরোজ আলম। ২৫ কেজি দুধ দেওয়া অস্ট্রেলিয়ান গাভী পাওয়ার আশায় আয়ের একমাত্র অবলম্বন ভ্যান বিক্রি করে ১৪ হাজার টাকা দিয়েছেন হতদরিদ্র ফারুক। আর নূরজাহান বেগম ভিক্ষা করে জমানো টাকা দিয়েছেন বয়স্ক ভাতা কার্ডের জন্য। কিন্তু তারা কেউই কিছু পাননি। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের নামে এমন প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধনবাড়ী উপজেলার উখারিয়াবাড়ী গ্রামের আবেদ আলীর ছেলে আসলাম হোসেন একটি গায়েবি প্রকল্পের কথিত এরিয়া ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে হতদরিদ্র অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জননেত্রী শেখ হাসিনা; আমেরিকা প্রকল্প প্রজেক্ট বনানী ১২ নং সেক্টর’ নামে একটি প্রকল্পের পরিচয়পত্র দেখিয়ে বেড়ান তিনি। সেখানে তার পদবি রয়েছে এরিয়া ম্যানেজার (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর)। এ প্রকল্পের আওতায় ঘর, গরু ও ভাতা কার্ড দেওয়ার কথা বলে তিনি প্রতারণা করেছেন।

জানা গেছে, ধনবাড়ী উপজেলার গাড়াখালী গ্রামের ফিরোজ আলমকে বলা হয়েছিল, এক লাখ টাকা জমা দিলে দুই লাখ টাকা মূল্যের ২৫ হাত দৈর্ঘ্যের ফ্লোর পাকা ঘর পাবেন। তিনি ১ বছর আগে ৪০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কিন্তু ঘর পাননি। একই এলাকার জমির উদ্দিনের ছেলে ফারুক তার আয়ের একমাত্র অবলম্বন ভ্যান বিক্রি করে ১৪ হাজার টাকা দিয়েছেন। তাকে একটি অস্ট্রেলিয়ান গাভী দেওয়ার কথা, যেটি দিনে ২৫ কেজি দুধ দেবে। ১০ মাসেও পাননি তার দুধেল গাই।

বাড়ৈপাড়ার মকবুলের স্ত্রী নূরজাহান বেগম বয়স্ক ভাতা কার্ড পেতে ভিক্ষা করে জমানো ৭ হাজার টাকা দিয়েছেন আসলামকে। শুধু ফিরোজ, ফারুক, নূরজাহান নন; আসলামের প্রতারণা শিকার হয়েছেন উপজেলার আরও অনেকেই। তাদের মধ্যে একজন উখারিয়াবাড়ীর খোকা রবিদাস। পেশায় মুচি রবিদাস একটি ঘরের আশায় ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। নিজ এলাকায় বিশ্বাস জন্মাতে রবিদাসের ঘরের জন্য ১৬টি খুঁটি কিনে পোঁতা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির বাকি ৩০ হাজার টাকা দিতে বিলম্ব হওয়ায় সেগুলো ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

চারিশিমুলের কাঠমিস্ত্রি শান্ত ৪৪ হাজার টাকা, উখারিয়াবাড়ীর হানিফ ৫০ হাজার, জুয়েলের স্ত্রী ইতি ১০ হাজার, ইসলামপুরের আলাল উদ্দিনের স্ত্রী রহিমা ৫২ হাজার, মৃত শুক্কুর আলীর স্ত্রী সালমা বেগম ৫২ হাজার, বাড়ৈপাড়ার সেলিম ১১ হাজার, পাইস্কা ইউনিয়নের ধুকেরকুলের লিটন ও সাইফুল ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তাদের কেউই পূর্ণাঙ্গ ঘর পাননি। কেউ পেয়েছেন চাল, তো কেউ পেয়েছেন খুঁটি। কাউকে দেওয়া হয়েছে টিউবওয়েল। আস্থা জন্মাতে চাল-আটাসহ ঈদ উপহারও দিয়েছেন প্রতারক আসলাম।

আসলামের প্রতিবেশীরা জানান, প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসলামের খোঁজে বাড়িতে আসেন। তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তাদের ঝগড়াও বাধে।
ইসলামপুরের রহিমা বেগম জানান, আবেদন করতে ১৫০০ টাকাসহ এ পর্যন্ত ৫২ হাজার টাকা দিয়েছেন তিনি। শর্তের ৬ হাজার টাকা বাকি থাকায় তার ঘরের বেড়া ও অন্যান্য কাজ করে দেওয়া হচ্ছে না। তবে তার বোন নাকি শর্তের টাকা পরিশোধে ঘরের পুরোটাই পেয়েছেন। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সহায়তার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দুই একজনকে ঘরের আংশিক; কাউকে টিউবওয়েল, আবার কাউকে চাল-আটা দিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে।

ধনবাড়ী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান সুমন বলেন, তিনি এমন প্রকল্পের নাম শোনেননি। পাইস্কা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফ বজলুর বলেন, ইউনিয়নে এমন প্রকল্প চলছে বলে তার জানা নেই।

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত আসলাম হোসেন বলেন, করোনাকালে অনেক মানুষকে তিনি সহযোগিতা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্পের নামে সহযোগিতার কথা তিনি অস্বীকার করেন। দাবি করেন, কেউ তাকে হেয় করতে এমনটা করছেন। তিনি এলাকার অসহায়-গরিবদের সহযোগিতা করছেন নিজের টাকায়। এ জন্য তিনি ধনবাড়ী শহরে ১৫ শতক নিজস্ব জমিও বিক্রি করেছেন। আগামীতে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে তার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

দুই বছর পর মাগুরায় আলিম হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদ্ধার করলো পিবিআই

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি- ঝিনাইদহ পিবিআই দীর্ঘ দুই বছর পর আলিম হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করলো। এ …

error: Content is protected !!