ভাসানচরে আজ যাচ্ছে আরও এক হাজার রোহিঙ্গা পরিবার

 

দ্বিতীয় দফায় স্বেচ্ছায় আরও এক হাজার রোহিঙ্গা পরিবার ভাসানচর যাচ্ছে। আজ সোমবার দুপুরের মধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠ এলাকা থেকে তিন দলে ভাগ হয়ে বাসে চড়ে চট্টগ্রামে যাবে তারা। তিন ধাপে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে তাদের। গতকাল রবিবার বিকেলে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যেতে উখিয়া কলেজ মাঠে অস্থায়ী ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।

সেখানে রোহিঙ্গাদের রাতে থাকার জন্য কাপড়ের প্যান্ডেল ও বুথ তৈরি করা হয়েছে। মূল ক্যাম্প ছাড়াও ৩৪টি ক্যাম্প থেকেই ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গারা গতকাল বিকেল ৪টা থেকেই ট্রানজিট পয়েন্টে আসতে শুরু করেছে। আজ সকালেও অনেকে এসে যোগ দেবে।
কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়া প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে আরও জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে যেতে নিরুৎসাহিত করতে এখনো একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ফলে প্রথমবারের মতো এবারও স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে মুখ খুলছে না। তবে উখিয়া ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে প্রস্তুতি চলছে। এর আগে ক্যাম্পের মাঝিদের মাধ্যমে তালিকা করা হয়েছে। গত শনিবার থেকেই যেতে ইচ্ছুক পরিবারগুলোকে তাদের মালামাল গুছিয়ে নিতে বস্তা, কার্টনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হয়। ট্রানজিট ক্যাম্পে নিরাপত্তা জোরদার এবং খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) একাধিক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতবারের মতো এবারও র‌্যাব-১৫ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। উখিয়া ডিগ্রি কলেজের মাঠ থেকে আজ তিন ধাপে ৩০টি বাস ও ২০টি ট্রাকে করে রোহিঙ্গাদের প্রথমে চট্টগ্রাম বোট ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা হবে তারা।

গত ৪ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ১ হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গা ভাসানচরে গেছে। এর আগে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে সমুদ্র উপকূলে আটক আরও তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে সেখানে নিয়ে রাখা হয়।

টেকনাফ নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালংয়ের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পের মাঝিরা বলেন, গতবারের উল্টো এবারের চিত্র। ওই সময় রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিতে অনেক বোঝাতে হয়েছে। কিন্তু ২০ দিনের মধ্যে চিত্র পাল্টেছে। এবার রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে নিজেরাই তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ভাসানচরে ৪ ডিসেম্বর যাদের আত্মীয়স্বজন গেছে, তাদের কাছে সুযোগ-সুবিধার খবর শুনেই অনেকেই যেতে উদগ্রীব। গতবার যখন জোর করে গোপনে বিভিন্ন অপপ্রচার থেকে লুকিয়ে তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে আনা হয়েছিল, এবার সেরকম নয়। বিকেলে অনেকেই প্রথম ট্রিপের যাত্রী হতে ক্যাম্পে এসে পড়েছে।

জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের তালিকাভুক্ত ক্যাম্প ছাড়া বাকি সব ক্যাম্প থেকেই যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কুতুপালং-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৮ ডব্লিউ ক্যাম্প থেকে যাচ্ছে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার। উখিয়ার কুতুপালং-৪ নম্বর ক্যাম্প থেকে ২৭ পরিবার যাবে। কুতুপালং-২ ডব্লিউ থেকে যাবে ২৪ পরিবার।

উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের (ইস্ট) মাঝি বলেন, ‘আমার ব্লক থেকে কয়েকটি পরিবার ভাসানচরে যাচ্ছে। তাদের কাউকে জোর করা হয়নি। ’ একই ক্যাম্পের সাবেক মাঝি নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘এ ক্যাম্প থেকে আবদুস সালাম ও আবুল হাশেম মাঝির পরিবারসহ বেশকিছু ঘর নোয়াখালীর ভাসানচরে যাবে। প্রথম দফায় যারা গেছে, তাদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধার খবর জেনেই নতুন করে অনেকেই যেতে আগ্রহী হয়েছে। ’

এসব মাঝি জানান, ভাসানচর পরিদর্শন শেষে ফিরে আসা রোহিঙ্গা নেতাদের মুখে সেখানকার বর্ণনা শুনে এবং প্রথম ধাপে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দেওয়া অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অনেকেই সেখানে যেতে রাজি হয়েছে। তাদের মতে, পাহাড়ের ঘিঞ্জি বস্তিতে বসবাসের চেয়ে ভাসানচর অনেক নিরাপদ হবে। এছাড়া সেখানে বসবাসের জন্য নির্মিত অবকাঠামোয় অনেক বেশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে বলে মনে করছে রোহিঙ্গারা।

এদিকে চট্টগ্রামে থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে নৌবাহিনীর জাহাজ। চরে নেওয়ার প্রথম দুই মাস তাদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হবে। এরপর নিজ নিজ অবস্থানেই রান্না করার ব্যবস্থার উদ্যোগ রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ভাসানচর যাত্রা নিয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভাসানচরের পথে চট্টগ্রাম থেকে চূড়ান্তভাবে জাহাজে না ওঠা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের যাত্রা নিয়ে কোনো কথা না বলার বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সময়মতো গণমাধ্যমকে সবকিছু জানিয়ে দেওয়া হবে। ’

সমাজকল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার (স্কাস) চেয়ারপারসন জেসমিন প্রেমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের বিশেষ আশ্রায়ণ প্রকল্পের আওতায় নিরাপদ জীবনের কথা চিন্তা করে পরিবেশবান্ধব ভাসানচরে স্থানান্তর একটি মহতী উদ্যোগ। আমরা যা ধারণা করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ও নিরাপদ জায়গা মনে হচ্ছে ভাসানচর। ’ তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটির কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধার খবর পেয়ে তাদেরই অনেক আত্মীয়স্বজন দ্বিতীয় দফায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে যাচ্ছে। প্রথম দফায় যারা গেছে, তারা অনেক আনন্দে আছে। সেখানে তিনটি নতুন শিশু এসেছে। শিশু ও মায়ের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত রয়েছে। ’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুর রহমান বলেন, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো থেকে রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় একটি দলকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তবে তিনি দিনক্ষণ কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই স্থানান্তর হবে।

রোহিঙ্গাদের ভাসানচর নেওয়ার আগে পালস বাংলাদেশ সোসাইটি, কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ, ফ্রেন্ডশিপ, এসএডব্লিউবি, শারজাহ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, গ্লোবাল উন্নয়ন সংস্থা, আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার, সনি ইন্টারন্যাশনাল, আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশন, হেলথ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

মহান মে দিবস আজ

পয়লা মে আজ। মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা দিন। ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে …

error: Content is protected !!