বালিয়াকান্দিতে পাল্লা দিয়ে চলছে ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর মহোৎসব

শেখ রনজু আহাম্মেদ রাজবাড়ী প্রতিনিধি: রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় আইন অমান্য করে ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানী কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ইট তৈরির কাজে কৃষি জমি ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। পাল্লা দিয়ে ইট ভাটায় কাঠ ক্রয় করে জমা রাখা হচ্ছে।

বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মোট ১২টি ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটাগুলো হলো কেএসপি বিকস, আরকে বিকস, এআরবি বিকস, এবিএম বিকস (নতুন নাম আরএসবি), এনএসবি বিকস, টিএমবি বিকস (দুটি), এডি বিকস (দুটি), রনি বিকস, এমএইচডি বিকস ও হাজী সুপার বিকস। এসব ইটভাটার মধ্যে আতাউর রহমানে এআরবি বিকসের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বাকী ইটভাটার মধ্যে চারটি ঝিকঝাক ইটভাটা। এতে কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। কেএসপি বিকস, আরএসবি বিকস, টিএমবি বিকস, এডি বিকস, এমএইচডি বিকস ও হাজী সুপার বিকস ইটভাটায় জ্বালানী হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয়।

সরেজমিনে ইসলামপুর ইউনিয়নের গণপত্যা, নবাবপুর ইউনিয়নের ইন্দুরদী ও বালিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের ভীমনগর গ্রামে ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, ইটভাটা ঘেঁষে গ্রামীণ পাকা সড়ক। পাকা রাস্তা থেকে হাতের ডান দিকে ইটভাটার অফিস। রাস্তা থেকে কিছুদুর এগুলেই হাতের ডানদিকে স্থায়ী ওজন পরিমাপক যন্ত্র (ওয়েট স্কেল)। অনেকেই কাঠ নিয়ে পোড়ানোর জন্য প্রস্তুত করছে। ভাটার মধ্যে কাঠ জড়ো করে রাখা হয়েছে। পুরোদমে কাঠ পুড়িয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে।

এসময় কথা হয় কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে। তাঁরা জানায়, প্রতিদিন হাজিরা হিসেবে কাজ করছেন। একারনে কত মণ কাঠ কাটা হয়েছে তার হিসেব রাখা হয়না। তবে মণ প্রতি কাঠের দাম রাখা হয় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বিভিন্ন প্রজাতির গাছের কাঠ ও গাছের গোড়া মূলত পোড়ানোর জন্য আনা হয়।
ইটভাটাটি রাজবাড়ী-বালিয়াকান্দি সড়কের ইসলামপুর ইউনিয়নের গণপত্যা এলাকায় কেএসপি ইটভাটা অবস্থিত। ইটভাটা থেকে প্রায় পাঁচশ গজের মধ্যে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাটার তিনপাশ দিয়ে ফসলী জমি। ইটভাটার দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে পোড়ানোর জন্য কাঠ এনে রাখা হয়েছে। বড় কাঠগুলো কুড়াল দিয়ে চেরাই (পোড়ানোর উপযোগি ছোট ছোট টুকরা) করা হচ্ছে। কেউ কাঠ পরিমাপ করার কাছে ব্যস্ত। পরিমাপ করার পর কাঠ ভাটার প্রয়োজন তা বলতে কেউ রাজি হয়নি।

গণপত্যার কেএসপি ইটভাটার মালিক ৩জন। একজন শাহীনের ভাই পার্টনার পরিচয়ে বলেন, আমি একজন পার্টনার। কাঠ দিয়ে প্রতিবছরই ইট পোড়ানো হয়ে থাকে। প্রশাসনকে আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চাঁদা দিয়ে থাকি।

ইন্দুরদী ইটভাটাটি ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছেন নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, রামদিয়া এলাকায় আমার আরেকটি ইটভাটা রয়েছে। এই ইটভাটা চলতি বছর ভাড়া করেছি। আমরা পরে ইট কয়লা দিয়ে পোড়াবো। আর জ্বালানী হিসেবে যেসব কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে তা কোনো ভালো মানের কাঠ নয়। তাছাড়া ইটভাটার কারনে অনেক নিন্মমানের কাঠ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়রা কাঠের ভালো দাম পেয়ে উপকৃত হচ্ছে।
ভীমনগর এম এইচ বিকসের ভাড়া নেওয়া মালিক জিয়াউর রহমান মুঠোফোনে বলেন, আমি ফরিদপুরে আছি। স্বাক্ষাতে কথা বলবো।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন (সংশোধিত) অনুসারে, আবাসিক, সংরিক্ষত ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর ও কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এসব এলাকা থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দুরে ইটভাটা হবে স্থাপন করতে হবে।
জ্বালানী কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধকরন সম্পর্কে ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কোনো জ্বালানী কাঠ ব্যবহার করতে পারবেন না।
১৬ ধারায় বলা আছে, যদি কোন ব্যক্তি ধারা ৬ বিধান লঙ্ঘন করে ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করেন, তা হলে তিনি অনধিক তিন বছর কারাদন্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৮ এর উপ-ধারা (১) এর বিধান লংঘন করে নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করেন, তাহলে তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদন্ড বা পাঁচলাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। (২) যদি কোন ব্যক্তি ধারা ৮ এর উপ-ধারা (৩) এর শর্তাবলি লঙ্ঘন করে ইটভাটা স্থাপন করেন, তাহলে তিনি অনধিক এক বছরের কারাদন্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

১৫ ধারায় বলা আছে যদি কোনো ব্যক্তি, ধারা ৫ এর (ক) উপ-ধারা (১) এর বিধান লঙ্ঘন করে, ইট প্রস্তুত করার করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হতে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসাবে উহা ব্যবহার করেন; বা (খ) উপ-ধারা (২) এর বিধান লঙ্ঘন করে, ৩৮ [জেলা প্রশাসকের] অনুমোদন ব্যতীত ইট প্রস্তুতের উদ্দেশ্যে মজা পুকুর বা খাল বা বিল বা খাঁড়ি বা দিঘি বা নদ-নদী বা হাওর-বাওড় বা চরাঞ্চল বা পতিত জায়গা হতে মাটি কাটেন বা সংগ্রহ করেন; তাহলে তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসরের কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আম্বিয়া বেগম বলেন, ইটভাটাগুলো বেশ আগে থেকেই চলে আসছে। বেশ কিছু ইটভাটা ঝিকঝাক হিসেবে পরিবর্তন করা হয়েছে। আরো কিছু ভাটা পুরোনো পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। আর কাঠ পুড়ানো ভাটায় মাঝে মধ্যে জরিমানা করা হয়। তবে এবছর এখনও ইটভাটায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়নি। দ্রুতই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

গাইবান্ধায় ১ টাকার বাজার সহায়তা কার্যক্রম 

  মো:শামসুর রহমান হৃদয়,গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃএকদল শিক্ষার্থীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়েউঠা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমাদের গাইবান্ধা এর সহযোগিতায় …

error: Content is protected !!