লালপুরে খেজুর রস-গুড় সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত গাছিরা

 

মেহেরুল ইসলাম মোহনঃ শীতের আগমনে খেজুর রস-গুড় সংগ্রহের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ন্যায় নাটোরের লালপুরে উপজেলার দুড়দুড়িয়া, মনিহারপুর, রামকৃষ্ণপুর, মহারাজপুর, পাইকপাড়া, বেরিলাবাড়িয়া, বিলমাড়ীয়া এলাকায় শীত মৌসুমের শুরু থেকেই সুমিষ্ট খেজুর রস সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত সময় পার করে চলেছে গাছিরা।

উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের গন্ডবিল গ্রামের গাছি আবুল হোসেন জানান, তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস থেকে গুড় সংগ্রহের জন্য শীত আসার সাথে সাথে খেজুর গাছ পরিষ্কার শেষে সাত দিন পর প্রথম চাঁচ দেয়া হয়। চাচের উপর থেকে নিচের দিকে নালী তৈরী করে বাঁশের নল বসিয়ে নলের দুই পাশে বাঁশের শলার খুটি বসিয়ে মাটির হাড়ি পেতে রাখতে হয়। পর দিন খুব সকালে প্রতিটি গাছ হতে রসের হাড়িগুলো নামিয়ে রস একত্র করে ড্রামে জাল দিয়ে গুড় বা পাটালী তৈরি করা হয়।

তিনি আরো জানান, এ বছরে প্রায় ৮০-৯০ টি খেজুর গাছ ঝুরেছেন।

প্রতিদিন খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে তা জ্বালানোর কাজ শেষে গুড়-পাটালী তৈরী করে বাজারে নিয়ে ভেজাল মুক্ত গুড় এবং পাটালী বানিয়ে ভাল দামে বিক্রয় করে তার সংসার চালাতে সক্ষম হবে বলে আশা করছেন।

উপজেলার বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের মহারাজপুর গ্রামের গাছি শরিফুল ইসলাম বলেন, তার পিতার পেশা আঁকড়ে ধরে তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে তার সংসার পরিচালনা করে আসছেন।

বর্তমান প্রজম্মের লোকেরা এই খেজুর গাছ ঝোড়া(পরিষ্কার)কাজ করতে চায় না বলে অনেক খেজুর গাছ পরে আছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অপর দিকে শান্টু কামার জানান, গাছিরা শীত মৌসুমে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের জন্য তাদের ব্যবহৃত নতুন ও পুরাতন ছেনদাগুলো(বাটাল) মেরামত করার জন্য আসছেন। বিশ্বব্যাপি প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বর্তমান লৌহ, ইস্পাত ও কয়লার দাম বেশি হওয়ায় একখানা ছেনদা/বাটাল তৈরি করতে প্রায় ৪০০ হতে ৫০০ শত টাকা খরচ হচ্ছে।

প্রভাত পাল জানান, এই মৌসুমে মাটির হাড়ি তৈরি করে সেটি পুড়িয়ে রাখলে হাড়ির চাহিদা এবং ভাল দামে বিক্রয় করে লাভবান হওয়া যায়।কিন্তু এবছর করোনার কারনে পুড়ানো সম্ভব হয়নি বিধায় মাটির হাড়িগুলোর সরবরাহ করতে সময় লাগবে এবং খরচ বেশি পড়বে।

উপজেলার দুড়দুড়ীয়া ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আসাদ মোল্লা জানান, এক সময় এ অঞ্চলে অনেক খেজুর গাছ ছিল কেটে ফেলার কারণে আগের তুলনায় বর্তমান খেজুর গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এই এলাকার খেজুর রস, গুড়-পাটালীর স্বাদ ভাল এবং চাহিদা বেশি হওয়ায় খেজুর রসের ভিজাপিঠা, কাঁচা রসের ক্ষীর, পায়েস, ভাপা পিঠা, পাটালী সবার মুখে যেন শীতকালে নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে ছিল। খেজুর রসের গুড় এবং পাটালী তৈরী করে এলাকার মানুষের শীতের পিঠা খাওয়া, পরিবারের চাহিদা মিটানোসহ বাজারে বিক্রয় করে লাভবান হয়ে থাকতেন এলাকার গাছিরা।

এখনো এই সময়টিতে তারা সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গাছ থেকে রস নামানো। তারপরে রস গুলো জ্বালিয়ে গুড় করা তৈরি করা বিক্রি করা। আবার দুপুর থেকে উঠে গাছে উঠে গাছ লাগানো এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত এ কর্মকাণ্ড চলে। কেহ কেহ দিনের বেলাতে বাড়তি উপার্জনের জন্য গাছে হাড়ি পেতে রাখে যেগুলোকে গ্রামীণ ভাষায় মাতানী/ওলা বলা হয় সেগুলি তারা বিকেল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে। এইভাবেই সারা শীতের ৬মাস চরম ব্যস্ত সময় পার করে বলে জানান তিনি।

এ সময় গাছিদের ইনকামের পরিমাণ বেড়ে যায়,পারিবারিক সচ্ছলতা বাড়ে। খেজুর গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে চারিদিকে মুখরিত হয়।বাচ্চা ছেলে মেয়েরা ঘুম থেকে উঠেই খেজুরের কাঁচা রস মুড়ি দিয়ে খায় এটা গ্রামীণ মানুষের পুরাতন ঐতিহ্য। তারপরে রস জ্বালানির পরে দুধ আর রস মিশিয়ে ভাত খাই এতে অনেকের নেশা আছে।গুড় দিয়ে রুটি খাই খেজুরের রস এবং গুড় দিয়ে বিভিন্ন রকমের পিঠা পায়েস কুলি বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যদ্রব্য তৈরি হয় যা অন্য কোন মিষ্টি/চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরি হয়না।

খেজুর গুড়ের স্বাদ এবং গন্ধই আলাদা। খেজুর গুড়ের সাথে আখের গুড় বা চিনির গন্ধ এবং স্বাদে অনেকটা পার্থক্য রয়েছে একটির সাথে আরেকটি তুলনা হয়না। গেরস্থ তাদের জমির সীমানার আইলে সকলেই খেজুরের গাছ লাগিয়ে থাকে খুব অল্প জমিতে অনেক গাছ লাগানো যায়। সামান্যতম ১০ কাটা কিংবা এক বিঘা পরিমাণ জমিতে প্রায় ২০০/৩০০ খেজুরের গাছ করা যায়, যা দ্বারা একটা মাঝারি গাছির সংসার অবাধে চালানো সম্ভব। তাই খুব স্বল্প জমিতে অনেক খেজুরের গাছ লাগানো যায় এটি একটি বিশাল অর্থকরী ফসল ও বটে।কৃষকদের সচ্ছলতা বেড়ে যায়। খেজুরের গুড়ের মৌসুমে কৃষকেরা দোকান বাকির হালখাতা পরিশোধ করে ছেলে মেয়েদের জামাকাপড় বানিয়ে দেয় এবং সংসারের প্রয়োজনে অন্যান্য কাজকর্ম বা কেনাকাটার জিনিস খেজুরের গুড় রসের উপর নির্ভর করে তারা সারা বছর আশা করে থাকে এবং এই খেজুরের গুড়ের মৌসুমে তারা এটা সমাধান করে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

আমনধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে নন্দীগ্রামের চাষীরা

অসীম কুমার, নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ আমন ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে দেশের খাদ্য …

error: Content is protected !!