মহান শিক্ষা দিবস ও শিক্ষা দর্শন

আজ ১৭ই সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে এক প্রতিবাদী ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর শিক্ষা সংকোচনের লক্ষ্যে বিচারপতি এস এম শরীফের নেতৃত্বে শরীফ কমিশন গঠন করে যেখানে বাঙালির শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়ার নীল নকশা তৈরি করা হয়।
উক্ত কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৯শে আগস্ট প্রতিবেদন পেশ করেন যেখানে শিক্ষা ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষা ধনিক শ্রেণীর জন্য সংরক্ষণ, শিক্ষকদের বাকস্বাধীনতা হরণ, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ,১৫ঘণ্টা কর্ম সময় নির্ধারণসহ বর্ণমালা সংস্কারের প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু অকুতোভয় ও দেশপ্রেমিক বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজের ছাত্রছাত্রীবৃন্দ পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরোধিতা করে এবং প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর  সারাদেশে হরতাল আহবান করেন।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ও সমর্থনে হাজার হাজার লোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকাল দশটায় জড়ো হতে থাকে এবং মিছিল বের করেন। কিন্তু স্বৈরশাসক আইয়ুব খান মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গুলি নির্দেশ প্রদান করেন।
এতে নিহত হন ওয়াজিউল্লাহ,গোলাম মোস্তফা,বাবুলসহ নাম না জানা অনেকে  এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে সুন্দর আলী নামের এক শ্রমিক। ছাত্রজনতার এই আত্মাত‍্যাগ ও প্রতিবাদকে স্মরণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৭ই সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
শিক্ষার দর্শন —শিক্ষা মানুষের জীবনে এমন এক পরশপাথর যার কারণে মানুষ অন্তর্নিহিত শক্তি বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবিকতা ও মনুষত্ববোধ জাগ্রত করে নিজেকে পরিবার,সমাজ তথা সকলের জন্য কল্যাণকর এবং বাঞ্ছনীয় করে গড়ে তোলেন। মানুষ প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর মতো হিংস্রতা ও বর্বরতা  নিয়ে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সময়ের বিবর্তনে প্রতিবেশ বিদ্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের সমাজের জন্য যোগ্য মানবসম্পদে হিসেবে গড়ে তোলে।
মানব জাতির সভ্যতা বিনির্মিত হয়েছে মানুষের শিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা এবং অভিজ্ঞতা থেকে। তাই বলা যায় মানুষ হচ্ছে জ্ঞানের ভান্ডার এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীকে সভ্য ও আধুনিক করে গড়ে তুলেছে।তাই মানবজাতির সভ্যতার বিকাশে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।মানুষের সভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পৃথিবীতে মানব জাতি সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে এবং মানুষের জ্ঞানের অস্তিত্ব ও বিকাশ শুরু হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার বছর পূর্বে।
অতঃপর মানুষ জীবনের অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকতে প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবেলা ও অতিক্রম করতে বিভিন্ন কৌশল ও দক্ষতা অর্জন করে। আর এই প্রচেষ্টাকে সার্থক ও অর্থবহ করে তোলে নিজের জ্ঞানের সাধনা ও পূর্বপুরুষের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা।ফলে মানুষ প্রকৃতির সকল বন‍্যতা ও প্রতিকূলতা জয় করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। মানুষের চিন্তার বৈচিত্র‍্যই তাকে উন্নত জীবনের আভাসর দেয়।মানুষের উন্নত জীবনের স্বপ্ন তার অধিকার এবং শাশ্বত  চাহিদা।জন্মের পর হতে বহু সংগ্রাম ও সাধনায় পূর্বপুরুষের উপহার হিসেবে প্রাপ্ত সহজাত প্রবৃত্তি অধিকারবোধ প্রাপ্ত হয়।ফলে একজন সুস্থ, সুন্দর,সৃজনশীল কর্মক্ষমও গ্রহণযোগ্য মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা তার সহজাত প্রবৃত্তি।তার সেই অধিকার সুরক্ষার জন্য মানুষ দলবদ্ধ হয়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে বসবাস করে।তাই তার সেই অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও যোগ্য  মানবসম্পদ।আর মানুষ নিজেকে মানব সম্পদে রুপান্তরের জন্য প্রয়োজন আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা। তাই বলা যায় শিক্ষা ব‍্যতিত একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র কল্পনা করা অসম্ভব। প্রত্যেকটা মানুষ অসংখ্য আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নের ধারক ও বাহক।কিন্তু সকল মানুষ তার সেই যোগ্যতা প্রকাশ করতে পারে না এবং যারা পারে ইতিহাসে তারাই প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে বেঁচে থাকে। মানুষের সেই যোগ্যতাকে বিকাশে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে শিক্ষা।
শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত চিন্তা-চেতনা,দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ সাধন করে যোগ্য ও কাঙ্ক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।মানুষের এই রূপান্তর জীবনব্যাপী একটি প্রক্রিয়া যা কেবল মৃত্যুর মাধ্যমে থেমে যায়।তাই মানুষেরকে প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামে পরিশ্রম ও সাধনার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়।শিক্ষা অর্জন মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল কিন্তু সেই অধিকারের সুযোগ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের শিক্ষা অর্জনের ব্যাপারে তৎপর ও দূরদর্শী পৃথিবীতে সেই রাষ্ট্র ততবেশি উন্নত ও মানবিক।জাতিসংঘ শিক্ষাকে মানুষের সার্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে এবং তা সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে সকল রাষ্ট্রকে বাধ্য করেন। জাতিসংঘ শিক্ষাকে মানুষের আজন্ম অধিকার এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের জন্য বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
জাতিসংঘ মানুষকে এই পৃথিবীতে তার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষাই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা উপলব্ধি করে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ MDG( Millennium development goals )তে শিক্ষাকে ৭টি লক্ষ্যের মধ্যে দুই নম্বর  লক্ষ‍্য হিসেবে স্থান প্রদান করেন। সকলের জন্য সার্বজনীন শিক্ষা অর্জনের  মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। ২০০০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তা গৃহীত হয় এবং ২০১৫ সালের মধ্যে তা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও অধিকাংশ রাষ্ট্রের অমনোযোগিতা ও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয়।ফলে ২০১৫ সালে এমডিজি(MDG) এবং সবার জন্য শিক্ষা(EFA) এর সম্প্রসারিত ও অধিক কার্যকরী উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি (Sustainable development goals) গ্রহণ করেন এবং তা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।SDGতে ১৭টি  লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এবং ৪নং লক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীন মানসম্মত শিক্ষা জীবনব্যাপী নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় এবং সকল লক্ষ্য  অর্জনের পুরোধা হিসেবে শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়।কেবল শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী মানুষের দারিদ্রতা এবং বৈষম্য দূর করা সম্ভব। শিক্ষাই পারে প্রকৃতিতে সহাবস্থানের নীতি বজায় রেখে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে উন্নত ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা।পৃথিবীতে মানুষে- মানুষে বৈষম‍্য ও আস্হাহীনতা, জেন্ডার বৈষম্য,শোষন ও বঞ্চনা, যুদ্ধবিগ্রহ- প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমনসহ মানুষকে পূর্ণ মর্যাদা ও অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা প্রদান করে সমাজে কাঙ্খিত ও যোগ্য মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই শিক্ষা। তাই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য  ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সকল রাষ্ট্র শিক্ষাকে মানুষের আজন্ম ও সার্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে  স্বীকৃতি দিয়েছে। কিছু কিছু রাষ্ট্র শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্থান দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত,শ্রীলঙ্কা,নেপাল ও মালদ্বীপ এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। পক্ষান্তরে  বাংলাদেশ এখনও শিক্ষাকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে নয় মৌলিক অধিকারের উপকরণ হিসেবে সংবিধানের 15 নং অনুচ্ছেদে ঠাঁই দিয়েছে।শিক্ষা মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিকাশের মূল মন্ত্র।শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ নিজের যোগ্যতা ও ক্ষমতার স্ফুরণ ঘটিয়ে  নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে তার জীবনের সৌন্দর্য ও ব‍্যক্তিত্ব অর্জনে সহায়তা করে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি,রুচিবোধ, ধ‍্যান-ধারনা, সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতা অর্জনে ও বিকাশে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।তাই এক কথায় বলা যায় শিক্ষার শক্তিই মানুষের প্রকৃত শক্তি এবং শ্রেষ্ঠ অর্জন। ছাত্র শিক্ষক জনতার সম্মিলিত প্রয়াসে তা ব‍্যর্থ হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আকঙ্খা তীব্র হতে থাকে। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের এই প্রতিবাদে শহীদ সকল বীরদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর অন‍্যায় শাসন ও জুলুমে বাঙালী ছিলো অতিষ্ঠ। শাসকশ্রেণী বাঙালী জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেবার অসৎ অভিপ্রায়ে শিক্ষার উপর হাত দেয়। ছাত্র-শিক্ষক -জনতার সম্মিলিত প্রয়াসে তা ব্যর্থ হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে থাকে। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিতে এই প্রতিবাদে শহীদদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
লেখক : মোহাম্মদ মোতাহার বিল্লাহ্।
 উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। সদর,মৌলভীবাজার।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

করোনা কেড়ে নিল সাড়ে ৯লাখ মানুষের প্রাণ

স্বাস্থ্য ডেস্কঃ বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ছাড়িয়েছে। …

error: Content is protected !!