ধ্বংসের মুখে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প, প্রয়োজন সরকারি সহায়তা

আমিনুল ইসলাম হিরো, সিরাজগঞ্জ: বিশ্ব ব্যপি মহামারি করোনা ভাইরাস ও কয়েক দফা দীর্ঘ মেয়াদি বন্যার কারনে সিরাজগঞ্জ জেলার প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ তাঁত শিল্প সহ কৃষি ও মৎস্যের ব্যপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কৃষিতে জেলায় মোট ক্ষতির পরিমান ২২৫ কোটি টাকা এবং মৎস্য খাতে ২৪ কোটি টাকার পরিমান দেখান হলেও জেলার ৫ টা উপজেলার প্রধান আয়ের উৎস তাঁত শিল্পের ক্ষতির কোন হিসাবই নেই।

বন্যায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু শাহজাদপুরের তাঁতীরা। করোনা ভাইরাসের লক ডাউনে ব্যবসা-বানিজ্য বন্ধ থাকায় তাঁতীরা হারিয়েছে তাদের পুঁজি। আর বন্যায় তাঁত কারখানায় পানি ঢুকে পাড়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তাঁতীদের। পোকামাকড় কেটেছে তাঁতে থাকা কাপড়, ত্যানাসহ সরঞ্জমাদি। এসব কারণে শাহজাদপুরের তাঁতশিল্পে প্রায় ৫’শ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে তাঁতীদের সংঘঠনের নেতা আলমাছ হোসেন জানায়।

গত ৫ মাস ধরে বন্ধ থাকা তাঁত শিল্প পুঁজি হারা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চালু করতে না পারায় ১ লাখেরও বেশী তাঁতী ও শ্রমিক সর্বশান্ত হচ্ছে।জানা গেছে, তাঁতসমৃদ্ধ শাহজাদপুরে ১ লাখেরও বেশি পাওয়ারলুম ও ৫০ হাজারের বেশি হ্যান্ডলুম (চিত্তরঞ্জন) রয়েছে। করোনা ও বন্যার কু-প্রভাবে গত ৫ মাসে এলাকার প্রায় ৮০/৯০ হাজার তাঁতই বন্ধ রয়েছে। এতে ১ লাখেরও বেশি তাঁতী ও শ্রমিক বেকায় হয়ে মানবেতরভাবে দিন কাটাচ্ছে।
এ মন্দাবস্থার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শাহজাদপুরের অন্য সকল ব্যবসায়ী ও অন্য পেশা মানুষেরও। শাহজাদপুরের তাঁতপল্লীতে তৈরি উন্নতমানের বাহারি ডিজাইনে শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি, থ্র্রি-পিছ এবং গামছা দেশে চাহিদা মিটিয়ে এখন রপ্তানি শিল্পে পরিনত হয়েছে তাঁত। আমাদের পাশের দেশ ভারতসহ মধ্য প্রাচ্যেসহ অনেক দেশে, বছরে হাজার কোটি টাকার তাঁতবস্ত্র রফতানি হয় এ অঞ্চল থেকে।
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে তাঁতবস্ত্রের রপ্তানিকারক, দেশি ক্রেতা, ব্যাপারী ও পাইকারের আগমন কমে যাওয়ায় করোনার ক্রান্তিকালের পূর্বে উৎপাদিত তাঁতবস্ত্রের মজুদ এখনও অবিক্রিত রয়ে গেছে কিছু অংশ বলে তাঁতীরা জানান। নিরূপায় হয়ে অনেক তাঁতী মজুদকৃত তাঁতবস্ত্র সোহাগপুর, এনায়েতপুর, আতাইকুলা, পোড়াদহ, করটিয়া, বাবুর হাট ও গাউসিয়া হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে গিয়েও ক্রেতার অভাবে তা বিক্রি করতে পারছে না।

ফলে তারা পুঁজিশূণ্য হয়ে প্রতিনিয়ত হুতাশার মাঝে দিন কাটাচ্ছে। নতুন করে তাঁত সাজিয়ে শাড়ী, লুঙ্গী, থ্রি-পিছ উৎপাদন করা স্বল্প আয়ের তাঁতীদের জন্য কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাংক অথবা অন্য কোন ঋণ প্রধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নেই তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ। বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁত ও তাঁতকারখানা মেরামত, তাঁতী ও শ্রমিক পরিবারে জীবিকা নির্বাহ, ঋণের কিস্তি ও সুদের ঘানি টানতে গিয়ে দিনে দিনে অথৈ ঋণের মরণ জালে তাঁতীরা আটকা পড়ছে।ফলে দেশের সর্ববৃহৎ কুঁটির শিল্প তাঁত এখন ঐতিহ্য সংকটাবস্থা পড়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শকালে শাহজাদপুর পৌর এলাকার তাঁতপল্লী রূপপুর নতুন পাড়া ও উরির চর মহল্লার মৃত বছির উদ্দিনের পুত্র প্রান্তিক তাঁতী রহমত আলী (৭০) কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, ‘২টি তাঁত বন্ধ থাকায় ৪ সদস্যের পরিবারের জীবন থমকে দাঁড়িয়েছে। জীবন-যাপন ও সন্তানদের লেখাপড়ার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ৫ মাসে তার ১ লাখ টাকা লোকসান হওয়ায় পুঁজিশুণ্য ও ঋণগ্রস্থাবস্থায় অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’
একইভাবে গত ৫ মাসে এ মহল্লার মৃত আমান মুন্সীর ছেলে শফিকুল ইসলামের ১৬টি তাঁত বন্ধ থাকায় ১০ লাখ টাকা, রূহুল আমিনের ১২টি তাঁত বন্ধ থাকায় ৫ লাখ টাকা, নুরু মিয়ার ছেলে শাহান আলীর ১৪টি তাঁত বন্ধ থাকায় আড়াই লাখ টাকা, আলম কাজীর ১০টি হ্যান্ডলুম ও ৮টি পাওয়ারলুম বন্ধ থাকায় ৬ লাখ টাকা, আব্দুর রহিমের ২টি পাওয়ারলুম বন্ধ থাকায় ১ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে।

হাতে টাকা না থাকায় এসব তাঁতী তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও তাঁত মেরামত ও কাঁচামাল কিনে তাঁত চালু করতে পারছেন না। এ করুণাবস্থা শুধু এসব তাঁতীদের নয়, শাহজাদপুরের সকল তাঁতীই অর্থ সংকটে পড়েছে। ফলে তাদেরও লোকসানের হার উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। এসব বিষয়ে গতকাল বুধবার দুপুরে শাহজাদপুর হ্যান্ডলুম ও পাওয়ারলুম এসোসিয়েশনের আহবায়ক তাঁতী নেতা হাজী নজরুল ইসলাম চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা প্রকাশ করে জানান, ‘ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ও তাঁতীদের এমন করুণ দশা জীবদ্দশায় কখনও দেখিনি। এ দুরবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই শিল্পটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে ও সর্বশান্ত হয়ে যাবে এলাকার লাখ লাখ তাঁতী।’

এদিকে, বাংলাদেশ স্পেশালাইজ টেক্সটাইল এন্ড পাওয়ারলুম ইড্রাষ্ট্রিজ এসোসিয়েশসের উত্তরাঞ্চলের পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ জেলা তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি কেন্দ্রীয় তাঁতী নেতা বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হায়দার আলী আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, এক সময়ে দেশিয় তাঁতে তৈরি মসলিন জগৎ জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলো। মসলিন তৈরির পথকে চিরতরে রূদ্ধ করতে বৃট্রিশ বোনিয়ারা তাঁতীদের আঙ্গুল কেটে দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করলেও ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প তখনও টিকে ছিলো।

কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাব ও এবারের বন্যায় এলাকার তাঁতীদের ক্ষতি সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। গত ৫ মাসে শাহজাদপুরের তাঁতীদের কমপক্ষে ৫’শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিলুপ্তির হাত থেকে তাঁতশিল্পকে রক্ষায় প্রান্তিক তাঁতীদের মাঝে সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে স্বনির্ভর করে তোলা অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ্ মোঃ শাহসুজ্জোহা জানান, ‘তাঁতীদের লক ডাউনের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছি। মাননীয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ক্ষতির বিষয়ে অবগত করেছি। এবং তাদের পূনর্বাসনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অবহিত করা হয়েছে। আশা করি সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সর্বচ্চ গুরুত্ব দেবেন’।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে ভোগান্তিতে স্থানীয়রা

রাকিবুল হাসান সুমন,ত্রিশাল ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাটি ভরাট …

error: Content is protected !!