রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

৬৭ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠা লাভ করে দেশের অন্যতম বৃহত্তম বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহীর বড়কুঠিতে মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি অনুষদের অধিনে ৫৯টি বিভাগ আর ৬টি ইনস্টিটিউটে ১২৬০ শিক্ষক আর প্রায় ৩৮ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে আলোর প্রদীপ ছড়াচ্ছে। যার ফলস্বরুপ হাঁটি-হাঁটি পা পা করে ইতিহাস আর ঐতিহ্যে ৬৭ বছর পেরিয়ে ৬৮ তে পা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

ষাটের দশক থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনেক অবদান। ৬২’এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’এর গণঅভ্যুথান, ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষার্থীরা স্বাধিকার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অত্যাচার আর শোষণের বিরুদ্ধে। সেই স্বাধিকার সংগ্রামের ইতিহাসে যুক্ত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহার নাম। ৬৯ এর গণআন্দোলনে তৎকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে শহীদ হন তিনি।

দীর্ঘ ৬৭ বছরের এই দিনটিকে স্মরণ করতে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও কিছু কর্মসূচী হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। করোনা পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে উদযাপিত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সোমবার (৬জুন) সকাল দশটায় প্রশাসন ভবন চত্ত্বরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের নিকটে বৃক্ষরোপন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্যদ্বয় অধ্যাপক ড. আনন্দ কুমার সাহা, অধ্যাপক ড. চৌধুরি মো. জাকারিয়া এবং প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান। পরে অনলাইলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় স্যাডলার কমিশনের ভূমিকা তুলনাবিহীন। ১৯৫৩ সালে ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৪ সালে পদ্মার তীরের বড় কুঠিতে। পরে ১৯৬১ সালে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় মতিহারের সবুজ চত্ত্বরে। যার স্থাপত্য পরিকল্পনায় ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানি টমাস। শুরুতে দর্শন, ইতিহাস, বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, গণিত ও আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি অনুষদের অধিনে ৫৯টি বিভাগ। উচ্চতর গবেষণার জন্য রয়েছে ৬টি ইনস্টিটিউট।

বড় কুঠির সেই বিদ্যাপিঠটির আয়তনও বেড়ে ৩০৩ দশমিক ৮০ হেক্টরে। ১২৬০ শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজারে। অর্থাৎ সেই ১৬১ শিক্ষার্থীর বিদ্যাপিঠে পদচারণা এখন ৩৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর। রয়েছে বেশকিছু বিদেশি শিক্ষার্থীও। এছাড়া বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন । ১২টি একাডেমিক ভবনসহ বর্তমানে রাবির ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১১টি ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৬টি হল এবং বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে একটি ডরমিটরি।

সম্প্রতি স্কোপাসের প্রকাশিত জরিপে গবেষণাকর্মসমূহ এবং গবেষণা সংশ্লিষ্ট পরিমিতির নিরিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। দেশের অন্যতম সেরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও অত্যাধুনিক এবং শিক্ষা ও গবেষণার মান সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৫০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনাকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বে এ মহাপরিকল্পনাসহ আরও বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। যার মধ্যে সাত পুকুর গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা জালিয়াতি রোধে প্ল্যাগারিজম প্রকল্প, বিশ্ববিদ্যালয় আরকাইভস ও অনলাইনে তথ্য জমা রাখার জন্য ‘আরইউ ক্লাউড’, ব্র্যান্ডিং গিফট শপ, বিশ্ববিদ্যায়ের নিউজলেটার ‘বিদ্যাবার্তা’, বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যচিত্র, সৌন্দর্যবর্ধণ, ওয়েবসাইট আধুনিকীকরণ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের নামকরণ।

এছাড়াও একটি ২০ তলা আবাসিক ভবন ছেলেদের ও মেয়েদের একটি ১০ তলা আবাসিক হল নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলেছেন, চলমান প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হবে দেশের সবচেয়ে অত্যাধুনিক ও মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে। ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক পরিষদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয়। একই বছরের ৬ জুলাই ড. ইৎরাত হোসেন জুবেরীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি করে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। সেই সময় পদ্মাপাড়ের বড় কুঠি ও রাজশাহী কলেজের বিভিন্ন ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬১ সালে বড় কুঠি থেকে নয়নাভিরাম মতিহারের এ সবুজ চত্বরে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম।

সুদীর্ঘ ৬৭ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জড়িত হয়েছে বেশ কিছু প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। যারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়ে অনেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখেছেন। দীর্ঘ এ সময়ে রাবি তৈরি করেছে ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম, তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান, খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডেভিড কফ, তাত্ত্বিক ও সমালোচক বদরুদ্দীন উমর, সাংস্কৃতিতে ক্ষেত্রে সংগীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোর, এহসান রাহি, ক্রিকেটে আল-আমিন ও ক্রিকেটার মুশফিক বাবু অন্যতম। এছাড়া চলচ্চিত্র পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম, নাট্যকার মলয় ভৌমিক প্রমুখ রয়েছেন।গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে স্মরনীয় করে রেখেছে।

নিউজ ঢাকা

আরো পড়ুন,নোয়াখালীতে মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এক মাসের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

রোবট ‘সিনা’র পর কুবি শিক্ষার্থীদের নতুন আবিষ্কার রোবট ‘ব্লুবেরি’

কুবি প্রতিনিধি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের(কুবি) শিক্ষার্থীরা এক নতুন রোবট আবিষ্কার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সঞ্জিত …

error: Content is protected !!