বাংলার ঐতিহ্যবাহী

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তপ্রায় খেজুর পাতার পাটি

সজিবুল ইসলাম হৃদয় ও মেহেরুল ইসলামঃ গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্ত শিল্প,হাতে তৈরি খেজুর পাতার পাটি এক সময় মানুষের কাছে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও কালের পরিবর্তনে তা এখন বিলুপ্তির পথে।

ঐতিহ্যবাহী এ পাটির জায়গা দখল করে নিয়েছে শীতলপাটি, নলের পাটি, বিভিন্ন ধরনের চট ও কার্পেট, মোটা পলিথিন সহ হরেক রকমের উপকরণ। এগুলো তৈরি ঝামেলামুক্ত ও সহজে বাজারে পাওয়া যায় বলে আধুনিক যুগের মানুষ খেজুর পাটির পরিবর্তে এসব আধুনিক উপকরণ ব্যবহারে দিনদিন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর পাতার পাটির কদর।

একসময় গ্রামবাংলায় খেজুরপাতার পাটির বিকল্প হিসেবে কোনো কিছুই চিন্তা করা যেতো না। তখন গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ি-ঘরে গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে খেজুরপাতার পাটি ব্যবহার করা হতো।

কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তা আর কোনো বাড়িতে বলতে গেলে দেখাই যায় না। অতীতকালে গ্রামের নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সব পরিবারের মহিলারা তাদের ঘরে শোবার জন্য বা বারান্দায় বসার কাজে ব্যবহার করতো সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেজুরপাতার পাটি। এছাড়াও ধান, গম,মটর-মসুর সহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্য শস্য রোদে শুকানোর কাজেও ব্যবহার করা হতো এই পাটি।

তবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সেই খেজুর পাতার পাটির চাহিদা কমে গেলেও নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়ীয়া,বিলমাড়ীয়া, নওপাড়া, নাগশোষা, পাইকপাড়া, জামতলা, মনিহারপুরসহ তার পাশেপাশে আজও এই খেজুর পাটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য খেজুর পাতার পাটি তৈরি করে ব্যবহার করছে। সংসারে স্বামীর স্বল্প আয়ের পাশাপাশি কিছুটা বাড়তি অর্থের যোগান ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ মেটানোর জন্য অবসর সময়ে তারা যেটুকু সময় পায় সে সময়ে খেজুর পাতার পাটি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকে। হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর পাতারপাটিকে তারা নিজস্ব সংস্কৃতিতে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টি মুখর দিনে অবসর সময়ে মহিলারা বারান্দায় বসে কেউ কেউ খেজুরের শুকনো পাতা গাঁথার জন্য প্রস্তুত করছে,কেউ বা বোনানো পাটির বেড়ি জোড়া দিচ্ছে আবার কেউ বা নিজ মনে পাটি বুনে যাচ্ছে। তেমনি একজন উপজেলার মনিহারপুর গ্রামের বৃদ্ধ মহিলা হাজেরা বেওয়া(৬২)। তিনি জানান, এই গ্রামের নারীরা অবসর সময়ে পরিবারের অন্য কাজের পাশাপাশি শোবার জন্য,বসার জন্য খেজুর পাতার পাটি তৈরি করে থাকেন।

তিনি আরো জানান, এই গ্রামের অনেক নারীরা খেজুর পাতার পাটি বোনানোর পর ৫ হাত দৈর্ঘ এবং ৩ থেকে ৪ হাত প্রস্থের প্রতি পিস পাটি ৫০/৫৫ টাকা দরে বিক্রি করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করে।পাটি ব্যাবসায়ীরা এই পাটি গুলো সংগ্রহ করে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক (দরবার শরীফ,ওরস শরীফ,মাজার শরীফ)কার্যক্রমে বিক্রি করে থাকে। তবে বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রভাব/খেজুর গাছের বিলুপ্তি ও মোটা পলিথিনের তৈরি সপ/পাটির কারনে আগের তুলনায় এখন পাটির ব্যবহার অনেক কমে যাচ্ছে।

এছাড়া একই গ্রামের আকলিমা খাতুন জানান, বাড়ির চাহিদা মিটিয়ে এক সময় এই পাটি বাজারে বিক্রি করতেন। বর্তমানে এর চাহিদা না থাকায় এখন আর আগের মত পাটি তৈরি করেন না। খেজুর গাছ বিলুপ্তর কারনে রয়েছে উপকরণের সংকট।

এই প্রসঙ্গে প্রবীন সাংবাদিক আব্দুর রশিদ মাষ্টার বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাটি শিল্পটি আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে। ঐতিহ্যবাহী এ পাটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন খেজুর গাছ ও পাতার। সরকারের বন বিভাগ খেজুর গাছ লাগানোর জন্য জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করলে একদিকে যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া খেজুর গাছ রক্ষা পাবে। অপরদিকে পাটি শিল্পের সাথে জড়িতরাসহ অন্যান্য জনের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে পারবে বলে তিনি মনে করে।

এছাড়া বর্তমানে সরকারের বৃক্ষরোপন অভিযান অব্যহত রয়েছে।খেজুর গাছ রোপনে জমি কম লাগে এবং খরচ কম তাই অনান্য গাছের সাথে এই খেজুর গাছ ব্যাপকহারে লাগানো যেতে পারে।ফলে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসম্য রক্ষা হবে তেমনি এই খেজুর পাতার পাটি ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে প্লাস্টিকের বা পলিথিন দূষণ রোধ করা সম্ভব।তাছাড়া অধিক পরিমাণে খেজুর গাছ থাকলে বাংলার মানুষ খেজুর রসের মৌ মৌ গন্ধে পিঠা পায়েস,ক্ষীর-পুলির আসল স্বাদ ফিরে পাবে,তখন আর গুড়-চিনির ভেজাল স্বাদ থাকবেনা বলে জানান তিনি।

নিউজ ঢাকা

আরো পড়ুন,রাজবাড়ীতে মামা বাজার ই-কমার্স চালু

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

প্রধান শিক্ষক এখন গরু খামারের কেয়ারটেকার

তাসনীমুল হাসান মুবিন,স্টাফ রিপোর্টারঃ ময়মনসিংহের ত্রিশালের আলহেরা একাডেমী এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক …

error: Content is protected !!