পরিশুদ্ধ অন্ধভক্ত

অব্যক্ত কিছু স্মৃতির অনূভূতিতে লুকায়িত এক ব্যক্তিত্ব “শাহীন আহমেদ”

কাওসার আহমেদ: গল্পের শুরুটায় ছিল আবেগ প্রবণ কিছু কার্যকলাপ, হয়তো ভালোবাসা নয়তো পাগলামি, জানি না, কিন্তু আজও হৃদয়ে সাড়া দেয় কেন করেছিলাম? হয়তোবা সে সময় মস্তিষ্কে সুক্ষ্ম চিন্তা করার কোন ফুরসত ছিল না আমার, অন্যদিকে কোন অভিনব পদ্ধতিতে নিজেকে পরিশুদ্ধ অন্ধভক্ত হিসেবে উপস্থাপনের কোন গোপন বাসনাও ছিলনা।

তাই হয়তো বিষয়টি কখনো চিন্তা করিনি। তখন হৃদয়ে আন্দোলিত হয়েছিল একটি কথা “তারুণ্যের জয়গান” যেখানে ছিল একটি নাম “শাহীন আহমেদ” আর সেই ব্যক্তিত্বের মাঝে খুজেঁছিলাম কেরানীগঞ্জ এর গন মানুষের অদূর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। দূর্বার এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।

জীবনের প্রথম সাংবিধানিক অধিকার অর্থাৎ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা আমার জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। কখনোতো ভোট কেন্দ্রের ভিতরে যাইনি। তবে এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনের সময়ে আমার মা’কে ভোট দেওয়ানোর জন্য আমার বাবার সাথে ভোট কেন্দ্রের কাছে গিয়েছিলাম কিন্তু অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছি। কোন কারণ ছাড়াই সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা হঠাৎই মোটা লাঠি যাকে আমরা রোল বলি, সেটা নিয়ে দৌড়ে আমাদের ধাওয়া করলো। আমার বাবার সাথে আমি আরও অনেকে আচমকা দৌড়ে ব্যথা পেলাম। তাই চ্যালেঞ্জ মনে হয়েছিল।

যাইহোক, আমি কৈশোর থেকে তারুণ্যে সব সময়ই উপলব্ধি করেছি, বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে স্বাধীনতা শব্দের স্বার্থকতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মাঝেই লুকায়িত। আর আমার জীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক সৈনিকের গল্প শুরু হয়েছিল প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগের দিন থেকে। আমি চাইতাম এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে সবাই পছন্দ করে আবার ভয়ও পায়। এককথায় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

২০০৮ এর জাতীয় নির্বাচনের দিন আমার বাবা জিজ্ঞেস করছিল এবারতো নতুন ভোটার, ভোট দিবি। নৌকা ছাড়া অন্য কোন মার্কায় ভোট দিস না কিন্তু? আমি বললাম; এটাতো প্রথম ভোট একটু অভিজ্ঞতা হওয়া দরকার, অনেকের ভোট নাকি ভুল করলে বাতিল হয়ে যায়। আগে অভিজ্ঞতা হোক তারপরে আপনার মনোনীত মার্কায় ভোট দিব। তখনও আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে আমার বাবা কিছুই জানতেন না। আমি নৌকা মার্কায় ই ভোট দিলাম।

বেশ কিছুদিন পর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের বিষয়ে জানতে পারলাম। এ বিষয়ে একটু কৌতূহল ছিল কারণ মাঝে কয়েক বৎসর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বন্ধ ছিল। তখন নির্বাচনী প্রচারণা চলছিল। আমার বাবাকে দেখলাম বেশ কিছুদিন যাবৎ কাছের সবাইকে “রিকশা” মার্কায় ভোট দেওয়ার কথা বলছেন। আমার মা’কে বলছেন তোমার সব পরিচিত মহিলাদের বলে দিও অবশ্যই সবাই যাতে ভোট দেয় আর “রিকশা” মার্কায় দেয়।

আমার মা রক্ষণশীল ও ধার্মিক হওয়ার সুবাদে অনেক মহিলাদের সাথে সু-সম্পর্ক ছিল। উনিও সবাইকে রিকশা মার্কায় ভোট দিতে সুপারিশ করতেন। আমি জানি আমার মা যাদেরকেই বলেছে তারা কেউ আমার মায়ের কথা ফেলবেন না। আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম রিকশা মার্কার লোকটি কে?
তিনি বললেন আওয়ামী লীগ এর মনোনীত প্রার্থী শাহীন। শহীদ নূর ইসলাম কমান্ডার এর জামাতা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম নূর ইসলাম কমান্ডার সাহেব কে?

তাঁরপর, নূর ইসলাম কমান্ডার এর মৃত্যুর নিষ্ঠুর ও করুণ ইতিহাস শুনলাম। আগেও অল্পবিস্তর শুনেছিলাম কিন্তু এত গভীর ভাবে কখনোই শুনিনি। আমার আব্বা বললো উনার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম সঠিক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ ত্যাগী মানুষের পরিবারকেই এমন সুযোগ দিয়ে সন্মানিত করা উচিৎ।

আমি আগে জানতাম না আমরা যে মহল্লায় থাকতাম সেই মহল্লায় শাহীন আহমেদ এর নানাবাড়ী, উনার মামাতো ভাইদের সাথে কত খেলাধুলা আর খুনসুটি করেছি তাঁর ইয়ত্তা নেই। নির্বাচনের ফলাফলের পর জানতে পেরেছি যখন হোলি খেলার মত সবাই আনন্দ মিছিলে রং খেলছিলাম তখন।

তবে সেই দিন টা ছিল আমার জন্য খুবই উৎফুল্ল ও চঞ্চলতা সমৃদ্ধ একটা দিন। ঐদিনের মত আমি জীবনে কখনোও এতটা উচ্ছ্বসিত ছিলাম না। আমার কাছে দিনটি ছিল অবিস্মরনীয়। আমি কিছু সময়ের জন্য খুবই ব্যস্ত ছিলাম, একজন নুতন অতিথির জন্য অপেক্ষমান ছিলাম, কারণ একজন জনপ্রতিনিধিকে তাঁর কর্মস্থলে প্রবেশের দিনে সর্ব প্রথম শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ পেয়েছিলাম।

সেদিন আমাদের কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মেইন গেইট থেকে পুরাতন হলরুম পর্যন্ত রাস্তার দুই পার্শ্বে সারি বেঁধে আমার কয়েকজন বন্ধু, সহকর্মী, কিছু বড় ভাই আরো অনেককেই জোড় করে দাঁড় করিয়ে হাতে একটি করে প্লেট ধরিয়ে দিয়েছিলাম। কমপক্ষে শ’খানেক প্লেট। সবগুলোই ফুলের পাপড়িতে পূর্ণ ছিল। সবাইকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলাম হলরুম পর্যন্ত আমরা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাবো আর বৃষ্টির মত ফুলের পাপড়ি ঝড়তে থাকবে।

অনেক অপেক্ষার পর এলো সেই কাঙ্খিত প্রহর। কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ কালো রং এর একটি গাড়ীতে করে উপজেলা পরিষদের গেইট দিয়ে প্রবেশ করছে আর আমার ইশারায় শুরু হলো ফুলঝুরি ড্রাইভার গাড়িটিকে ধীরে ধীরে সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল হলরুমের কাছাকাছি কিন্তু ফুলের পাপড়িতে গাড়ির সামনের গ্লাস সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত হয়ে গেল। ড্রাইভার আর সামনে এগুতে পারছিলেন না। বাধ্য হয়ে গাড়ী স্থির করে গ্লাস থেকে ফুলের আচ্ছাদন হটিয়ে তারপর এগুতে হল। আমার নেতৃত্বে “শাহীন ভাইয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম” স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল উপজেলা পরিষদের অভ্যন্তরের সেই সরু রাস্তাটি। আমি অনেক গুলো ফটো সুট করেছিলাম শুধু ফুলের পাপড়িতে আচ্ছাদিত কালো সেই গাড়ীটির।

গাড়ী থেকে কেরানীগঞ্জ এর আরেক ব্যক্তিত্ব নসরুল হামিদ বিপু সাহেব সহ নেমে হলরুমে প্রবেশ করলেন। মূহুর্তেই লোকে লোকারন্য হয়ে উঠলো টিনসেড সেই ছোট্ট হলরুমটি। ফুলের তোরা এবং ফুলের মালা নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। আমার বাবাও ছিল। দুটি মালা থেকে একটি আমার বাবাকে দিয়েছিলাম অপরটি কোন এক আওয়ামী লীগ নেতার হাতে দিলাম। অনেক কষ্টের বিনিময়ে টেবিলের উপর দাড়িয়ে কিছু ছবি তুলতে পেরেছিলাম।

অতিরিক্ত লোক সমাগমে সেদিন আর কাছে ঘেষতে পারিনি। তবে মন খুব আনন্দিত ছিল একজনের আগমনে। তিনি শাহীন আহমেদ।

পরবর্তী সময়ে একদিন একান্তভাবে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য এমপি হোষ্টেলে শাহীন ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল রোহিতপুর ইউনিয়নের কিছু বড় ভাইদের সাথে। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর অনেক কথা বললো শাহীন ভাই। উনার কথাগুলো শুনে সেদিন থেকেই উপলব্ধি করেছিলাম। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কেরানীগঞ্জ কে রাজনৈতিক ভাবে সুসংগঠিত করতে পারবেন। হতে পারবেন সব জনগনের জন্য একজন প্রকৃত জনপ্রতিনিধি। সেদিন উনার বাসায় আমাদের অনেক আপ্যায়ন করা হলো। তবে যেটা কখনো ভোলার নয় সেটা হলো শাহীন ভাইয়ের স্ত্রী অর্থাৎ মুক্তা আপার কথা। রাত তখন ১১:০০ অতিক্রম করেছে। তিনি আমাদেরকে সবাইকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য বললেন, খুব অনুরোধের কারণে নাজিম আহমেদ ভাই, আলমগীর ভাই আর আমি ডাইনিং টেবিলে বসলাম। মুক্তা আপা নিজ হাতে আমাদের খাবার দিচ্ছিলেন। পোলাও সাথে শর্ষে ইলিশ। তিনি আমাকে বললেন লজ্জা পাচ্ছো কেন? আমি মুক্তা আপার এমন সরল ব্যবহার ও আন্তরিকতায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম, কোন কথাই বলতে পারলাম না। কথা বলতে না পারাটা আমার ব্যর্থতাও বলতে পারেন। আমার কাছে তখন কথা বলতে না পরায় নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছিল। আসলে আমি এমনিতেই একটু লাজুক প্রকৃতির। গুছিয়ে বলতে পারিনা আর সৌজন্যতা ভালো বুঝি না। সেই স্মৃতিগুলো এখন শুধুই হৃদয়ের মানসপটে জাগ্রত, না কেউ কখনও মনে করবে না কারও মনে থাকবে। কিন্তু অনুভূতি গুলো ঠিকই হৃদয়ে থেকে যাবে চিরকাল।

আজকাল অনেক কিছুর মাঝেই এখন উপলব্ধি করি আমার হৃদয়ে অঙ্কিত বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শের সৈনিক শাহীন আহমেদ ভাই এর খুব কাছে থেকেও অনেক দূরে সরে গিয়েছিলাম নিজের অজান্তেই। তাঁর এত কাছে থেকেও একান্ত সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ তৈরী করতে পারিনি। অথচ, অনেক ব্যক্তিকে দেখি, যারা শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই পাশে থাকার অভিনয় করে যায়। কাছে যেতে পারিনি সেটাও আমারই ব্যর্থতা। কিন্তু তাঁর দূরদর্শী কার্যক্রমগুলো আমাকে খুবই কাছে টানতো। তাঁর কিছু বিষয় আবার মনমধ্যে দ্বিধাবোধও তৈরি করেছিল। সময়ের সাথে সাথে অনেকগুলো বিষয়ের সমাধানও দেখেছি। কেন এমন করতে হয়েছিল? সেটাও বুঝতেও পেরেছি।
আসলে দূরে থেকে সবকিছু কখনোই উপলব্ধি করা যায় না। যেমনটা হয়তোবা আমার বেলায় হয়েছিল। সেকারণেই আমি উনার কাছে অন্যরকম ভাবে পরিচিত। অনেকটা নিন্দিত, অবহেলিত, আর মনে হয় সবসময় তাঁর কটাক্ষ দৃষ্টি যেন নিবদ্ধ রয়েছে শুধু আমারই উপর।

হ্যাঁ, শুধু উনার দৃষ্টিতে নয়, আমি আসলেই অপরাধ করেছিলাম। অস্বীকার করার কোনও উপায়ও নেই, কারণও নেই। তবে শুধু আকাঙ্ক্ষা ছিল এতটুকুই। আমাকে খুব একান্তভাবে যদি কখনো সে ভূলের জন্য বা অপরাধের জন্য Explain করার সুযোগ দেয়া হতো কখনো। তবে অপরাধের শাস্তি ভোগ করাটাও আমার কাছে অনেক কম মনে হতো। সে সুযোগ কখনো আসবে কিনা এখনও জানিনা। তবে আত্মসম্মানবোধ, হয়তোবা অহমিকা, সেই সাথে লজ্জা আমাকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে দিয়েছে। ভুল মানুষই করে, আর এজন্য “ক্ষমা” নামক এক গুন সৃষ্টিকর্তা মানব চরিত্রে দান করেছেন। ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহ তাআলার অনেকগুলো গুণবাচক নাম আছে যাকে “আসমাউল হুসনা” বলা হয়।

সেই সব গুন থেকে প্রতিটি মানুষের মাঝেই আল্লাহ তাআলা ইচ্ছানুযায়ী গুনীজনদের মাঝে কিছু কিছু দান করেছেন। শাহীন আহমেদ ভাই এর সেই রকম কিছু গুনের কারনেই আজ এই করোনা মহামারীর সময়ে আমার লেখাগুলো প্রকাশ করার ইচ্ছে উদয় হলো। তাই বলতেই হয়। পুনরায় আমি আজ শাহীন আহমেদ ভাইকে আবিষ্কার করলাম। নতুন রকমের এক ব্যক্তিত্বে। তাঁর সহানুভূতি, মানবিক আচরন ও আন্তরিকতা বোধ আমাকে আবারও হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে। আমি আজ আন্তরিক ভাবে উনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী এবং ধারাবাহিকভাবে সহানুভূতি প্রত্যাশী। এজন্যই লিখছি, অব্যক্ত কিছু কথা হয়তো না বললে কোনদিনই উনি জানতে পারবেন না।
উনাকে কেরাণীগঞ্জের গন মানুষের জন্য আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশায় তৈরী করেছিলাম কিছু পরিকল্পিত পলিসি।
আর হ্যাঁ আমার সেই পলিসির নামকরণ করেছি-
“জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সম্পর্কউন্নয়ন”

যদি উনার সহানুভূতি ও অনুপ্রেরণা পাই তবে আগামীতে বাকি কথাগুলো অবশ্যই বলবো। এই প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ …….

নিউজ ঢাকা

আরো পড়ুন,যেসব কাজ শুধু স্যামসাং ফোনেই করা যায়!

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু

নোয়াখালীতে মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এক মাসের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

নোয়াখালী সোনাইমুড়ীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আতাউর রহমান ভূঁইয়া স্কুল এন্ড …