পোশাকশ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব খোলায় বিড়ম্বনা

আরিফুর রহমান তুহিন :বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যভুক্ত ২ হাজার ২৭৪টির মধ্যে ২ হাজার ৫৬টি কারখানা বেতন পরিশোধ করেছে। বাকি কারখানাগুলোর বেতন ২২ এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করার চেষ্টা করা হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের এই হিসাব অনুযায়ী সদস্যভুক্ত ৯০ শতাংশ কারখানার বেতন পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে পোশাক কারখানার মালিকদের আরেক সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত ৮৩৩ কারখানার মধ্যে বেতন পরিশোধ করা হয়েছে ৪৮৭টির। সব মিলিয়ে রপ্তানিমুখী ৩ হাজার ১০৪ পোশাক কারখানার মধ্যে ২ হাজার ৫৪০টি কারখানা তাদের মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করেছে, যা মোট কারখানার প্রায় ৮৯ শতাংশ। এদিকে কারখানার শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব খুলতে বিড়ম্বনায় পড়ছেন মালিকরা।

বিজিএমইএর তথ্যমতে, তাদের সদস্য কারখানাগুলোতে ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৪১৭ জন শ্রমিক কাজ করেন। অন্যদিকে বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) অন্তর্ভুক্ত কারখানায় আরও প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তবে গড়ে ১০ শতাংশ শ্রমিক নিয়মিত চাকরি পরিবর্তন করেন। বেতন বকেয়া থাকা কারখানাগুলোর বড় একটি অংশের আজ পরিশোধের কথা রয়েছে। বাকিগুলোর অধিকাংশই ২২ এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করতে পারে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক। এ ছাড়া কয়েকটি কারখানা ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন পরিশোধের সময় নিয়েছে। অন্তত ২০টি কারখানা এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেনি। আর ১০টি কারখানা এখনো বেতন পরিশোধের নির্দিষ্ট তারিখ জানায়নি। এর মধ্যে ৫টি কারখানাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে মালিকদের সংগঠন দুটি।

এখনো এতগুলো কারখানায় বেতন বকেয়া থাকার বিষয়ে মালিকদের সংগঠন দুটির নেতারা বলছেন, যেসব কারখানায় বেতন বকেয়া আছে, সেগুলোয় শ্রমিকের সংখ্যা অনেক কম। মূলত লকডাউনের কারণে হঠাৎ সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক জোগান দিতে না পারায় বেতন পরিশোধে দেরি হচ্ছে। এ বিষয়ে রুবানা হক বলেন, ‘বাস্তবতার কারণে কিছু কারখানার বেতন দিতে দেরি হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত এসব কারখানার বেতন পরিশোধ করা যায়। ইতিমধ্যে বেশির ভাগ কারখানা বেতন পরিশোধের তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছে। কারখানাগুলো যেসব সমস্যার কারণে বেতন দিতে পারছে না তা সমাধানে সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। শ্রমিকরা মার্চের বেতন পাবেনই।’ এদিকে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে ২ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ঋণের টাকা সরাসরি শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে যাবে। এ জন্য শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব খুলছেন কারখানার মালিকরা। তবে অনেক শ্রমিক গ্রামে চলে যাওয়ায় এবং যোগদানপত্রে ভুয়া মোবাইল নম্বর উল্লেখ করায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাই এসব শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবও খোলা সম্ভব হচ্ছে না। মালিক সংগঠনগুলো বলছে, আর্থিক সমস্যা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিনড়ব এলাকা লকডাউন থাকায় বেতন পরিশোধে দেরি হচ্ছে অনেকের। গড়ে ১৭ লাখ শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব কারখানগুলোর কাছে আছে। বাকি ২২-২৩ লাখ শ্রমিকের নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে।

বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী গতকাল পর্যন্ত ১৯ লাখ ২০ হাজার শ্রমিকের নতুন ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বিকাশে ৯ লাখ ৭০ হাজার, রকেটে ৫ লাখ ৫০ হাজার ও নগদে ৪ লাখ। এখনো প্রায় ৩ লাখ শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব হয়নি। কারণ হিসেবে কারখানার মালিকরা বলছেন, একত্রে সব কারখানা তাদের শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব খোলায় ব্যাংকে চাপ বেড়েছে। অথচ অনেক কর্মকর্তা এখনো ছুটিতে। কমে গেছে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সময়সীমা। এ ছাড়া অনেক শ্রমিক চাকরিতে যোগদানের সময় ভুয়া কাগজপত্র ও মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। এখন ওই শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি কারখানার মালিকদের। তারা বলছেন, তারা বিভিনড়বভাবে এসব শ্রমিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এসব শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব না হলেও নগদে তাদের বেতন পরিশোধ করা হবে। তবে সে ক্ষেত্রে কিছুটা দেরি হতে পারে। এ বিষয়ে বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘অনেক শ্রমিক নিয়োগপত্র নেওয়ার সময় তাদের সঠিক তথ্য দেয় না। এমনকি মোবাইল নম্বরটিও ভুয়া দেয়। এখন এসব শ্রমিকের বড় একটি অংশ গ্রামে চলে গেছে। এখন এদের ফোনে যোগাযোগ করেও পাচ্ছি না। দেশের সব কারখানা মিলে এই সংখ্যা লক্ষাধিক হবে।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

উদ্যত শির লুটিয়ে দাও

  লেখক ডাক্তার রফিকুল ইসলাম হে বিশ্ব! থমকে দাড়ালে কেন? চমকে গেলে কেন? কোথায় তোমার …

error: Content is protected !!