ক্ষুধা যেথায় মৃত্যুকে হার মানায়

আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গলো অভূক্ত একজন মানুষের কান্নায়। চোঁখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দেখি ৫৫ বছরের এক নারী দুয়ারে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তার দু”চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরছে অশ্রুজল। ততক্ষণে আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে আমার স্ত্রী রিমি। করোনা সংক্রমনের কথা ভুলে গিয়ে গিন্নি ওই নারীকে শান্ত করলেন (সামাজিক দূরত্ব মেনে)। সাধ্য অনুযায়ী টাকা ও খাবার দাবার তুলে দিলেন। নারীটি চলে যাওয়ার পর ভেতর থেকে কত সহস্র প্রশ্ন আমাকে ক্ষত বিক্ষত করছিল তা হয়তো লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। বার বার চোঁখের সামনে ভেসে উঠছিলো প্রাপ্ত বয়স্কো ওই নারীর অসহায় মুখ। যা আমার বিবেক ও সত্তাকে ধিক্কার দিয়ে বলছিল অভূক্ত মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে সুখে থাক তোমরা।

মরনব্যাধি নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারে সাধারণ ছুটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এতে দেশের নিম্ন মধ্যবৃত্ত, নিম্নবৃত্ত ও দরিদ্র মানুষ হারিয়েছে কাজ, হারিয়েছে উপার্জন। প্রতিদিন এসব অভূক্ত মানুষের মিছিল যেন বেড়েই চলছে। তবে থেমে নেই তদের ক্ষুধার জ্বালা। ক্ষুধার্ত এসব মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে গত ১৫/১৬ দিনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ ওঠেছে। আবার যেটুকু ত্রাণ বা ভূর্তকির চাল এসেছে সেগুলো কোন কোন জায়গায় চুরি হচ্ছে নয়তো কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। গণমাধ্যমে এসব খবর হরহামেশাই আসছে। এ নিয়ে ধিক্কার, ঘৃণা ও ক্ষোভ বাড়ছেই। তবুও থেমে নেই চুরি। কেনই বা থামবে? যেখানে বাংলাদেশের স্থাপতি বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন স্বাধীনতার পর তিনি পেয়েছেন চোরের খনি। এই চোরের খনি তো সহজে নিশ্চিহ্ন হবার কথা নয়।

আমরা যারা মোটামুটি স্বচ্ছল বা ধনী শ্রেনীর লোকজন তারা নিজেদের রক্ষা করতে দু/তিন মাসের খাবার-দাবার নিয়ে নিজেকে ঘরবন্দী করেছি। আয়েশ করে বিবির হাতের রান্না খাচ্ছি। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথার ফুলঝুরি ফোটাচ্ছি। প্রতিবেশীর ঘরে খাবার আছে কিনা সেটি জনতে বয়েই গেছে আমাদের? তাদের অভূক্ত থাকার যন্ত্রণা কতটুকু? না খেয়ে থাকা শিশুটির আর্তচিৎকার মমতাময়ী মায়ের মনে অবস্থা কি? সেটি হয়তো ধামাচাপা পরে যাবে কালগর্ভে। গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া এসব লোকজনে কথা ক’জন আমরা ভাবছি? ভাবলেও কি তাদের জন্য কোন কিছু করতে পেরেছি? তারা বেঁচে থাক মারা যাক আমাদের কি? নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে আমিতো নিরাপদে আছি।

তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও কেউ কেউ নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে গাটের পয়সা খরচ করে মানুষের পাশে গিয়ে দাড়িয়েছেন। আবার বাড়িতে বাড়িতে সরকারি ত্রাণ পৌছে দিচ্ছেন ইউএনও/ এসিল্যান্ড/ উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তাগণ। জাতীর অনেক বীর সন্তান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাড়িয়েছেন মানুষের পাশে। দিনরাত মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এতে করে সমাজের ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয়, গার্ড, ডিসি, এসপি, ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রট, স্বাস্থ্য, ব্যাংক কর্মকর্তা, পুলিশ-সেনা ও সাংবাদিকসহ অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

আবার উল্টোটাও হচ্ছে। অনেক পেশার লোকজন নিজ জীবন বাঁচাতে জাতীকে বিপদে ফেলে পালিয়ে গেছেন লেজ গুটিয়ে। শুধু তারা কেন আমরা তো নিজেরাও নিজেদের দায়িত্ত্বটুকু পালন করছিনা। করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসায় পাশের বাড়ির প্রতিবেশীকে গালমন্দ করতে একটুও ছাড় দিচ্ছি না। মৃত্যু ভয়ে তার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করেছি। এসব ঘটনায় মানবিক কারণে হলেও তাদের প্রতি নূন্যতম সম্মান দেখানো কি আমাদের দায়িত্ব নয়? একবার ভেবে দেখবেন কি?

এখন প্রশ্ন হলো ছুটির মেয়াদ যদি দীর্ঘায়িত হয় তবে কি হবে তাদের? কাজ বন্ধ থাকলে এসব মানুষ কত দিন ঘরে থাকবে? তাদের হাতে কি পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা, খাবার-দাবার আছে? এ নিয়ে ভাববার সময় এখনি। নয়তো করোনা প্রতিরোধে নেয়া সব আয়োজন পণ্ডশ্রমে পরিণত হতে পারে। পেটে ভাত না থাকলে মৃত্যুুর ভয় করে কি হবে? ঘরে থেকে না খেয়ে মরার চেয়ে যুদ্ধ করে মরাই তাদের কাছে শ্রেয়। এমন প্রশ্ন এখন চারদিকের খুধার্ত মানুষের। সামনের কঠিন দিনগুলোতে এই চ্যালঞ্জ মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত তো?

লেখক:-
লিটন মাহমুদ
(সংবাদ কর্মী)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

মিডিয়া বিএনপি কে বাচিয়ে রেখেছে : কামরুল ইসলাম

সাবেক খাদ্য মন্ত্রী ও ঢাকা-২ আসনের এমপি এ্যাড: মো: কামরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি কোন দল …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!