বৈঁচি কথনঃ পথের ধারে হারিয়ে যাওয়া মহাঔষধ

‘খয়েরি অশ্বথপাতা–
বৈঁচি শেয়ালকাটা,
আমার দেহ ভালবাসে…’

জীবনানন্দ দাশ

কার বাগানে আম পাকতে শুরু করেছে, কোন বাগানে বৈঁচি ফল অপর্যাপ্ত ফলেছে, কার গাছে কাঁঠাল এই পাকলো বলে, কার মর্তমান রম্ভার কাঁদি কেটে নেয়ার অপেক্ষামাত্র, কার কানাচে ঝোঁপের মধ্যে আনারসের গায়ে রঙ ধরেছে, কার পুকুর পাড়ের খেজুর-মেতি কেটে খেলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা অল্প- শরৎচন্দ্রের ভাষায় এসব করেই তো কেটেছে আমাদের শৈশব- কৈশোর। আর সেই দূরন্ত কৈশোরের-ই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বৈঁচি।

বৈঁচিবৈঁচি বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের একটা। লম্বা লম্বা কাঁটা আর সবুজ পাতার মাঝে লাল লাল, ছোট্ট ছোট্ট ফল, এই হল বৈঁচি ফল। আমরা বলি বুঁজ। বাগেরহাটে এর নাম শুনেছি ডুঙ্কার ফল। ইংরেজি ভাষায় নাম governor’s plum , batoko plum ও Indian plum এবং বৈজ্ঞানিক নাম Flacourtia indica.

খুব ঘন ডালপালা, ঝোঁপালো। কাণ্ড ও ডাল বেশ শক্ত। কাণ্ডের একেবারে গোড়া থেকেই ডাল পালা বের হয়। বৈঁচির পাতা হালকা সবুজ, ডিম্বাকৃতির, অনেকটা কুল পাতার মতো। বৈঁচির প্রতিটা পাতার গোড়ায় একটা বড় কাঁটা থাকে। কাঁটা ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। বৈঁচির কাঁটা মারাত্মক জিনিস। বেশ সুঁচালো আর বিষাক্ত। শরীরের কোথাও বিঁধলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। এ কারণে এ ফল বরিশালে কাঁটাবহরী নামেও পরিচিত।

সাধারণত ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বৈঁচি গাছে ফুল ধরে। পাঁচ পাপড়িযুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির ফুল। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে ফল পাকতে শুরু করে। বৈঁচির ফল ছোট, অনেকটা কুলের মতো দেখতে। ভেতরে একটা শক্ত বিচি থাকে। বৈঁচির কাঁচা ফল হালকা সবুজ রংয়ের। ডাসা ফল হালকা বাদামি আর পাকা ফল জাম বা রক্ত বেগুনি রংঙের। দারুন টক মিষ্টি এক স্বাদের এই ফল, অন্যরকম, পরিচিত কোন স্বাদের সাথে মিল নেই…!!!

বাংলাদেশে এই ফলের চাষ করা হয় না, অযত্নে অবহেলায় ঝোঁপেঝাড়ে, ক্ষেতের পাশে বেড়ে ওঠে গুল্মজাতের এই গাছের চারা। নদীর পাড়, উঁইঢিবি, বাঁশবন, ফসল ক্ষেতের ঘন বেড়ায় এদের বাস। লোকালয়ে তেমন দেখা যায় না। বীজ ছাড়া শেকড় থেকেও নতুন চারা বের হতে পারে।

বৈঁচি ফলের গুনাগুন

বৈঁচি ফলে প্রচুর পুষ্টি আছে, বিশেষ করে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। দাঁতের গোড়া ফোলা, জণ্ডিসের মতো রোগের চিকিৎসায় বৈঁচি ব্যবহৃত হয়। বৈঁচি গাছের মূলের রস নিউমোনিয়া এবং পাতার নির্যাস জ্বর, কফ ও ডায়রিয়া নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। পাতা ও মূল অনেকে সাপের কামড়ের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করে। বাকলের অংশ তিলের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বাতের ব্যথা নিরাময়ে মালিশ তৈরি করা হয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে

Check Also

মুমিনের হৃদয়ে কারবালা র কান্না

সূফি কবি নজরুল বলেন,  কাদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে /সে কাদনে আসু আনে সিমারেরও ছোরাতে,   …

error: Content is protected !!