অবৈধ ফুটে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ; মানা হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা

ফুটপাত মানে হেটে চলার পথ। কিন্তু ঢাকার কেরানীগঞ্জে তার বাস্তবতা ভিন্ন। ঢাকার কেরানীগঞ্জ কালিগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী এলাকায় জেলা পরিষদ মার্কেটের ফুটপাত রয়েছে হকারদের দখলে। জিলা পরিষদ রোড রাস্তায় এবং তিনটি ব্রীজ দখল করে ছোট ছোট দোকান বসিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ ফুট মার্কেট। এতে করে ঐ রাস্তা দিয়ে যানবাহন ও লোকজন চলাচলে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিকাল থেকে চালূ হয়ে রাত ১২ টা পর্যন্ত চলতে থাকা এই সকল ফুটের প্রত্যেকটি দোকানে দেয়া হয়েছে অবৈধ ভাবে বৈদ্যুতিক বাতির সংযোগ। মানা হচ্ছে না বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের রাত ৮ টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশনা।

যেখানে দেশের চলমান লোডসেডিং মোকাবেলায় সরকারের নানা পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে রাত ৮ টার মধ্যে মার্কেটগুলো বন্ধ করা। সরকারের এই নির্দেশ অমান্য করে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লী এলাকার ফুট মার্কেট চলে রাত ১২ টার পরেও। অমান্য করা হচ্ছে রাত ৮ টার মধ্যে দোকান বন্ধ করার সরকারের নির্দেশনা। খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর এলাকায় এমনটি হওয়ায় অনেকের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

একাধিক হকারের সাথে কথা বলে জানা যায়, জিলা পরিষদ রোড ও গার্মেন্ট পল্লীর উপর অবস্থিত তিনটি ছোট ব্রীজে ফুটের ওপর প্রায় ৩০০ বেশি ফুট দোকান রয়েছে। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীর কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এই ফুট মার্কেট নিয়ন্ত্রন করে। এখানে দোকান বসানোর জন্য প্রতিটি হকারের কাছ থেকে জায়গার ভাড়া বাবদ নেয়া হয় মাসে ২ থেকে ৪ হাজার টাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বাবদ মাসে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। বিশেষ কোন দিন আসলে যেমন ঈদ পুজা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দিবসে হকারদের আলাদা ভাবে আরো টাকা দিতে হয়। এছাড়া প্রতিটি দোকানের জন্য এডভান্স বাবদ দেয়া লাগে ১৫-২০ হাজার টাকা। আর এর সবটাই যায় ঐ নেতাদের পকেটে। তবে কোন হকার ই ভয়ে সেই নেতার নাম প্রকাশ করতে চান নি। জনসাধারনের চলাচলের রাস্তায় এভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ফুট ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ায় অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে অবৈধ ভাবে রাস্তার জায়গা দখল করে ও অবৈধ ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ফুট চালাতে প্রশাসনকেও ম্যানেজ করে এইসব নেতারা।

এই ফুটকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অনেক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্য ক্ষোভ রয়েছে। একাধিক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এদের ক্ষমতার কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। এতো টাকা এডভান্স আর ভাড়া দিয়ে যে মাল আমরা ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি করি, ফুটের ব্যবসায়ীরা একই মাল ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি করে। এতে আমাদের লস হচ্ছে। ওদের তো কোন খরচ নাই তাই ওরা কম দামে বিক্রি করছে। আমাদের ক্রেতা কমে যাচ্ছে। আমাদের লস হচ্ছে। ফুটপাতের দোকানের ব্যাপারে মালিক সমিতি বা স্থানীয় প্রশাসন কেও কোন ব্যবস্থা নেয় না। এছাড়া এখানে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, যে কোন সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। আমরা এক প্রকার অসহায়। এ ব্যাপারে যথাযথ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো: ইউসুফ জানান, ফুটের দোকানের কারনে সাধারন জনগন ঠিকমতো হাটতে পারে না। যার কারনে প্রায়ই পথচারীদের সাথে ঝামেলা হয়। ফুট নিয়ন্ত্রন করে এখানকার দুই একজন প্রভাবশালী নেতা। তারা নিজেরা মাস শেষে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা ভোগ করে, আর দুর্দশা ভোগ করতে হয় এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের। স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রী, ব্যবসায়ী, এলাকার জনসাধারন সবার সমস্যা সৃষ্টি হয় এই ফুটের কারনে।

সরেজমিন কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীর জেলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুইপাশ দখল করে হকাররা যে যার মতো দোকান বসিয়েছে। অনেকে পথচারীদের পথ আটকিয়ে বসে আছে। এতে পরে  পথচারীদের ও যানবাহন রাস্তা পারাপারে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। হকাররা তাদের ময়লা আবর্জনা পাশেই শুভাড্যা খালে ফেলছে। দিনের বেলা ফুটপাতে কম সংখ্যাক দোকান বসলেও বিকাল থেকে পুরো রাস্তা জুড়েই জমে উঠে ফুটপাতের দোকান। কোন ভাবে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালী ঐ নেতাদের সেল্টারে যে যেমন ভাবে খুশি দোকানের পশরা সাজিয়ে বসে আছে। প্রতিটি দোকানেই জ্বলছে বৈদ্যুতিক লাইট, কোন কোন দোকানে একাধিক লাইটের সংযোগ ও দেখা গেছে। জানা যায়, সেন্টু নামে এক ব্যাক্তি একটি মার্কেট থেকে মিটার নামিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিদ্যুতের অবৈধ পার্শ্ব সংযোগ দিচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ আইন ২০১৮-এর ৩৮(খ) ধারা অনুযায়ী লিখিত অনুমতি ব্যাতীত মিটার থেকে কোন ব্যাক্তিকে পার্শ্ব সংযোগ দিলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও অজানা কারনে তা প্রয়োগ করছে না ঢাকা পল্লী বিদ্যুত সমিতির-৪ এর শুভাঢ্যা জোনাল অফিসের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে সেন্টুর সাথে কথা হলে সেন্টু জানায়, বিদ্যুৎ চলে মাত্র ৩/৪ ঘন্টার জন্য। শুধু আমার না এখানে আরো কয়েকজনের বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। জিলা পরিষদ মার্কেট থেকে লাইন নিয়ে আমরা চালাচ্ছি।

যেখানে সরকারের নির্দেশ রয়েছে রাত ৮ টার পরে সকল মার্কেট বন্ধ করে দিতে হবে। সেখানে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে রাত ১২/১ টা পর্যন্ত অবৈধ ভাবে ফুটে বিদ্যুৎ সংযোগ কিভাবে চালাচ্ছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে সেন্টু বলেন, প্রয়োজনে বন্ধ করে দিবো।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক মুসলীম ঢালি বলেন, আমরা দোকানদাররা সরকারের নির্দেশ মেনে রাত ৮ টার আগেই দোকান বন্ধ করে দেই। কিন্তু ফুটগুলো চলে। ফুটের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার যথাযথ কতৃপক্ষকে কয়েকবার জানিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ হয় নি।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমিতির সভাপতি স্বাধীন শেখ বলেন, ফুট নিয়ে আমাদের ব্যবসায়ীরা নানান সমস্যার মধ্যে আছি। ফুট মার্কেটের কারনে ব্যবসায়ীদের অনেক অসুবিধা হয়। এরা অবৈধ ভাবে রাস্তার জায়গা দখল করে বসে আছে। তার উপর অবৈধ ভাবে বৈদ্যেতিক সংযোগ ব্যবহার করছে। ফুট নিয়ন্ত্রন করে গার্মেন্টস পল্লীর কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। তাদের ক্ষমতার দাপটে ফুটের কারনে ব্যবসায়ীদের অসুবিধা হলেও আমরা কিছু করতে পারি না।

আগানগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর শাহ খুশি এই ফুট মার্কেটের ব্যাপারে দেশ রূপান্তরকে জানান, আমি গত কয়েকদিনে কদমতলী ও আশে পাশের অবৈধ ফুট উচ্ছেদ করেছি। গার্মেন্টস পল্লীর ফুট এর আগে কয়েকবার উচ্ছেদ করতে গেলে স্থানীয় আঞ্চলিক শাখার কিছু নেতাদের কারনে উচ্ছেদ করতে পারি নি। এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের সাথে কথা বলতে পারেন।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৪ এর সহকারী ম্যানেজার (শুভাঢ্যা জোনাল অফিস) আব্দুস সালাম রাফি জানান, সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী দোকানপাট রাত ৮ টার মধ্যে বন্ধ করার জন্য আমাদের নিয়মিত মনিটরিং টিম রয়েছে।। জিলা পরিষদ রোডে ফুটের ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য এই পর্যন্ত কেউ আমাদের দেয় নি। আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম, আমরা দ্রুতই ব্যবস্থা নিবো।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান জানান, রাস্তার ওপর কোন অবৈধ ফুট থাকবে না। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের তো প্রশ্নই আসে না। আমি এখন ই আগানগর ইউপি চেয়ারম্যানসহ দায়িত্বরতদের বলে দিচ্ছি। দ্রুতই ফুট উচ্ছেদ করা হবে।#

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে [sharethis-inline-buttons]

Check Also

কেরানীগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ

কেরানীগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে নীলা আক্তার নামে এক গৃহবধূকে দুই শিশু সন্তানসহ বাড়ি থেকে বের করে …

error: Content is protected !!